একজন পুরুষের চাকরি করা আর একজন নারীর চাকরি করা কখনো এক নয়।একজন নারী যখন চাকরি করে তখন তাকে চাকরির পাশাপাশি সংসার সামলাতে হয়।চাকরি করা যত সহজ সংসার করা তত সহজ নয়।একজন পুরুষ ডিউটির পর বাসায় এসে তৈরি করা খাবার খেয়ে নিজের মত বিশ্রাম করতে চলে যান।কিন্তু একজন নারীর ডিউটির পর বাসায় এসে রান্না করে, ঘর গুছিয়ে ফ্রেশ হতে যেতে হয়।আর সে যদি হয় সন্তানের মা তাহলে আর ব্যাখ্যা করার ফুসরত থাকে না।
মাধুরির বয়স ২৬ বছর।দুই বছর হল বিয়ে হয়েছে। একটা বিপনি-বিতানে বিক্রয় কর্মী হিসেবে কাজ করে। ওর ডিউটি সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা। ওর স্বামী একটা ট্রাবেলস এজেন্সিতে চাকরি করে।ওনার ডিউটি সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা।মাধুরি প্রতিদিন সকাল ৬টায় ঘুম থেকে ওঠে ফজরের নামাজ আদায় করে নাস্তা তৈরি করে। এরপর স্বামীর জন্য আর নিজের জন্য দুপুরের খাবার প্রস্তুত করে বক্সে ঢুকিয়ে রেখে স্বমীকে ডেকে দেয়। স্বামী গোসল করতে গেলে ও রুমটা গুছায়।তারপর স্বামীকে খেতে দিয়ে নিজে গোসল করতে যায়।মাধুরি যখন গোসল করে বের হয়, ওর স্বামী ততক্ষণে অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। স্বামীকে টিফিন, ওয়ালেট, ঘড়ি সব হাতের কাছে এনে দিলে তিনি অফিসে বের হয়ে যান।ততক্ষণে ঘড়ির কাটা ৯টা ছুই ছুই করছে।
তাড়াহুড়া করে নিজের নাস্তা সেরে আবার ডায়নিং টেবিল পরিস্কার করে কোনমতে প্রস্তুত হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পরে।কোনদিন ১০টা বেজে ওঠার ৫ মিনিট আগে কোন দিন ৫ মিনিট পরে সে কাজে ঢুকে। এরপর একজন বিক্রয়কর্মীর যা কাজ সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে কাস্টমারদের সাথে ডিল করা। এভাবে পূর্বের সূর্য মধ্য আকাশ পরিভ্রমন করে কখন পশ্চিমে ঢলে পরে তা অনুমান করার ফুসরত মাধুরি পায়না।
রাত আটটায় কাজ শেষে যখন বের হয় মাধুরির শরীর যেন আর চলেনা।বাসায় পৌঁছাতে বেজে যায় রাত নয়টা। ক্লান্ত শরীরে দুই মিনিট বিশ্রাম নেওয়ার সময় কোথায়। ব্যাগ রেখে দৌড়াতে দৌড়াতে ঢুকতে হবে রান্নাঘরে। রাতের খাবার প্রস্তুত করতে হবে। দশটা বাজে ওর স্বামী আসবে। ডিউটি থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে হাঁকডাক শুরু খাবার এখনো হয়নি।মাধুরি স্বামী কে খেতে দিয়ে নিজে ও খেয়ে নেয়। খাওয়া শেষে ওর স্বামী চলে যায় বেড রুমে এটা তার বিশ্রামের সময়।মাধুরির সব গুছিয়ে বেড রুমে যেতে কখনো রাত বারটা কখনো রাত একটা।এভাবেই চলে মাধুরির প্রতিদিন।
আজ শুক্রবার। ছুটির দিন।নাস্তা প্রস্তুত করে মাধুরি স্বামী কে ডেকে বলল ওঠে নাস্তা খেয়ে বাজারটা করে আস। সঙ্গে সঙ্গে ওর স্বামী বলে উঠল সপ্তাহে একটা দিন ছুটি তোমার চিৎকারে ঘুমানোর উপায় নাই।তুমি বাজারটা করে আসতে পার না।মাধুরি আর কিছু না বলে বাজারে চলে গেল। বাজার থেকে এসে সারা সপ্তাহের কাপড় ধোয়ার জন্য ভিজিয়ে দুপুরের রান্না করল।
ততক্ষণে ওর স্বামী খাবারের জন্য তাড়া দিচ্ছে।স্বামীকে খেতে দিয়ে ও কাপড় ধোয়ার জন্য গোসলখানায় ঢুকে গেল। কাপড় ধোয়ে গোসল করে মাধুরি যখন বের হলো তখন পড়ন্ত বিকেল। দুপুরের খাবারটা ও এখনো খাওয়া হয়নি মাধুরির। কাপড়ের পানি ঝরার ফাঁকে খেয়ে নিল।এরপর বারান্দায় গেল কাপড় মেলে দিতে।ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। কাপড় মেলার এক ফাঁকে আকাশে চোখ পড়তেই চমকে উঠলো মাধুরি। অর্ধডুবন্ত সূর্যের লালিমায় কি অপূর্ব সাজে সেজেছে পশ্চিম আকাশ। মাধুরি ভাবনার সাগরে নিমজ্জিত হল।সৃষ্টি কর্তা কি অপরূপ ভাবে সৃষ্টি করেছে এ ধরণী।তার কতটুকুই দেখেছি আমি।মেঘলা কিংবা রোদেলা পূর্নিমা কিংবা অমাবস্যা তার কোন পার্থক্য নেই মাধুরিদের কাছে।
সব পরিবারে চাকরিজীবী নারীদের জীবন এক নাও হতে পারে।তবে আমার দেখা অধিকাংশ চাকরিজীবী নারীদের জীবন চলে একই ধারায়।মুখে মুখে আমরা পরিবর্তনের সাগরে ভাসলেও প্রকৃতপক্ষে কতটুকু পরিবর্তিত হয়েছে এ সমাজ তা এখনো প্রশ্ন সাপেক্ষ।