তখন গ্রামের বাড়িতে ছিলাম,রাতে ঘরে শুয়ে আছি,হঠাৎ ধুমধাম কিছু শব্দ শুনতে পেলাম।মনে হলো,কেউ কাউকে হয়তো কিল-ঘুষি দিচ্ছে।তারপর আরও জোরে দস্তাদস্তির শব্দ শুনতে পেলাম এবং অনেক জোরে কাঠ ভাঙার শব্দ শুনতে পেলাম।আমাদের বাড়ির আশপাশে কোনো বাড়ি নেই,অনেকটুকু জায়গা আমাদের,তারপরও অনেক খালি জায়গা অন্যদের,বসতভিটা নেই।সুতরাং শব্দটা আমাদের জায়গা থেকে আসছে।কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না শব্দটা আমাদের জায়গা থেকে কিভাবে আসছে!
তারপর মনে পড়লো।আমাদের বাহিরবাড়িতে একটা বসার জায়গা বানানো হয়েছে যেটাকে আমাদের গ্রামের ভাষায় বলে 'চাঙারি'।চারপাশে বাঁশের খুটি,তারপর উপরের দিকে সুপারি গাছকে কেটে ভাগ ভাগ করে,ছাদ হিসাবে ব্যবহার করে এই চাঙারি বানানো হয়।আমাদের বাহিরবাড়ির আশপাশ খোলামেলা থাকায়,প্রচুর বাতাস থাকে সবসময়।আর তখন গরম কাল ছিলো।একদল পাড়ারই ছেলে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো আমি শুতে আসার আগে দেখে এসেছিলাম।
তারা বাতাসে বসে আড্ডা দিচ্ছে ।আমি গিয়ে একবার দেখে এসেছিলাম,যেহেতু আমাদের জায়গা।কে কে বসে আছে দেখা দরকার,পরে কোন অঘটন ঘটালে দোষ হবে আমাদের।গিয়ে দেখি সবই আশপাশেরই ছেলেপেলে।বসে লুডু খেলছে স্মার্টফোনের মাঝে এপস দিয়ে।একটা সময় ছিলো,এই অন্ধকারে বসে লুডু খেলা সম্ভব ছিলো না।কারণ লুডুর বোর্ড দেখতেতো আলো লাগবে।এখন এরা অন্ধকারে বসে ফোনের মধ্যেই লুডু খেলছে প্রযুক্তির কল্যাণে।সে যাইহোক তখন তিনজন ছিলো।
এসব মনে পড়াতে আমি বুঝতে পারলাম,তাহলে ওদের মধ্যেই কিছু একটা ঘটেছে।আর তখন চিল্লাপাল্লাও শুরু হয়ে গেলো।আমি যেতে যেতে ঘটনা শেষ,আকস্মিকভাবে সব ঘটে গেলো।গিয়ে ঘটনাটা শুনলাম।যে তিনজন বসে খেলছিলো,এদের নাম আরিফ,ছোটন,ইমন।এরা সবসময় একসাথেই চলাফেরা করে।আমি যখন একটু আগে এদের খেলা দেখতে এসেছিলাম,তখন তারা কতই না হাসি তামাশা করছিলো।তো আমি চলে যাওয়ার পরও তারা খেলছিলো,একটু পর ইমন আর আরিফ কি নিয়ে না জানি কথা কাটাকাটি লাগে।ছোটন নাকি ফিরাতে চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি।দুইজনই শক্তিশালী।এরমধ্যে এদের চিল্লাপাল্লা শুনে ইমনের মা-বাবাও চলে এসেছে।কারণ আমাদের বাড়ির পরে যে অনেক ফাঁকা জায়গা এরপর প্রথম বাড়ি ইমনদের।আর ছেলে এই জায়গায় বসে আড্ডা দিচ্ছে এটা ইমনের মা তো জানেই তাই এইদিকে নজর ছিলো।তো ইমনের মা-বাবা আসার পর তিনি ইমন আর আরিফকে দস্তাদস্তি থেকে আটকাতে চেয়েছেন,তিনি নাকি আরিফকে জোরে ধাক্কা দিয়েছেন।এতে আরিফ মনে করলো,নিজের ছেলের হয়ে আমাকে মারলো।সে ইমনের বাবাকেও দিলো কিছু কিল-ঘুষি।তারপর অনেক মানুষ জড়ো হওয়াতে তারা দুইজন দুইদিকে চলে গেলো।ফাঁকে দিয়ে ইমনের বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো।এ নিয়ে পরে আরও বড় পারিবারিক দাঙ্গা হাঙ্গামা হলো।
কিন্তু তখন আমার আরও কিছু দিন আগের দুটো ঘটনা মনে পড়লো।সেদিনও আমি ঘটনা ঘটার পর সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম।আমি উপস্থিত হওয়ার আগে সেখানে বাঁশ দিয়ে বিরাট এক লড়াই হয়ে গেলো।আমি বাজারে যাচ্ছিলাম পথে তাদের সাথে দেখা।আমার মামাবাড়ির এলাকার নাম "আলমদী",তার কিছু ছেলে।এরা আমাদের গ্রামে হয়তো কোনো কাজে এসেছিলো,তখন এই আরিফ,ছোটন,ইমন আরেকটা ছেলে সাব্বির এরা মিলে তাদেরকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠায়।
এদেরকে পিঠানোর কারণ সেই আরেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।তারা নাকি একদিন আলমদী গিয়েছিলো।ঐসময় আমি বেশকিছু দিন আলমদী ছিলাম।তবে ঘটনার সময় আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না।তখন দেখতাম প্রায় প্রতিদিন আমাদের গ্রামের কিছু ছেলে আলমদী যেতো,গিয়ে ঐখানকার ছেলেদের সাথে আড্ডা দিতো আর কি কি না জানি করতো!দেখতাম খুব গলায় গলায় ভাব।আমি এক দুই দিন গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে চলে এসেছিলাম।এরপর আরেকদিন কি নিয়ে কথা কাটাকাটি,সেখান থেকে মারামারি,এমনকি আমাদের গ্রামের ছেলেদের মানে ঐ যে ছোটন,আরিফ,সাব্বির,ইমনদের নাকি চার-পাঁচ কিলোমিটার দৌড়িয়ে আলমদী থেকে বের করে।
তো ঐদিনের প্রতিশোধ নিতেই তারা নিজের গ্রামে পেয়ে এদেরকে বাঁশ দিয়ে পিটায়।তো এসব ঘটনা মনে পড়াতে আমি ভাবলাম,এরা ঐ আলমদীতে কতো ভালো বেড়াতে যেতো প্রতিদিন, সেখানকার ছেলেদের সাথে কতভালো বন্ধুত্ব,সেই বন্ধুত্ব কিভাবে শত্রুতায় পরিণত হলো আর মার খেতে হলো,আবার নিজের এলাকায় আসাতে মার দিতে হলো।সে ভালো কথা অন্য গ্রামের ছেলেদের সাথে মারামারি লেগেছে,সবাই এক হয় তাদের মার দিয়ে দিয়েছে।ওরা তিন-চার জনের মধ্যে বন্ধনতো তাহলে খুব মজবুত!একসাথে মার খেয়েছে আবার দিয়েছে!কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওদের নিজেদের মধ্যে কি হলো যে নিজেদের মধ্যে মারামারি লাগতে হলো,আর একজনের বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো।তার মানে বুঝা গেলো,এরা ঝগড়ুটে।
গ্রামে হোক বা শহরে,কিছু ছেলেপেলে এমন থাকে যে যারা ঝগড়া করবেই।এক এলাকা আরেক এলাকার সাথে।যদি অন্য এলাকার সাথে ঝগড়া করার সুযোগ না থাকে তাহলে নিজেদের মধ্যে হলেও ঝগড়া করবেই করবে।এদের ঝগড়া করা ছাড়া শান্তি লাগে না।এরা নিজেরা ঝগড়া করেতো ঠিক, সাথে সাথে পরিবারকে বিপদে ফেলে আবার সমাজ ব্যবস্থাকেও অস্থির করে তুলে।এদের যে কবে সুবুদ্ধি হবে!