কখনো ঢাকা যাওয়া হয়নি। ঢাকা শহর কেমন দেখা যায়? ঢাকা শহরে কি আছে? সেখানকার মানুষজনই বা কেমন? সেখানে সবাই কি আমার ফুফির মতো? এসব ভাবতে ভাবতে দিন দুই কেটে গেল। সেদিন দাদা-দাদির সাথে ঢাকা ফুফির বাসায় যাওয়ার কথা। খুব সকালে আম্মু ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিল। তারপর খাওয়া-দাওয়া সেরে রেডি হয়ে বাড়ি থেকে রওনা দিলাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে। একটু পর বাস আসলে আমরা বাসে উঠে রওনা দিলাম ঢাকার দিকে। রাস্তায় দাদা-দাদিকে হাজার রকমের প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। এটা কি? ওটা কি? এটা কেন? এটা কিভাবে? এরকম আবোল-তাবোল প্রশ্ন করতে করতে দাদা-দাদিকে বিরক্ত করে ফেললাম। রাস্তায় ছিল প্রচুর জ্যাম। একবার জ্যামে আটকে গেলে ১৫-২০ মিনিটের আগে আর বাস ছাড়ে না। এটা এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। অবশেষে ৫-৬ ঘন্টা পর মহাখালি রেলগেইটে পৌছালাম। তারপর বাস থেকে নেমে রিক্সায় করে সাতমাথায় পৌছালাম। রিক্সা একদম ফুফির বাসার সামনে গিয়ে থামল। ফুফি বাসা থেকে নিচে নেমে এসে আমাকে আদর করে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর সবাই ফুফির বাসায় গেলাম।
কিন্তু সেখানে আমার কেমন জানি দম বন্ধ লাগল।
Image Source
খেলাধুলা করার মতো কেউ নেই সেখানে। আবার চাইলেও বাইরে বের হওয়া যায় না। সেখানে আমাদের গ্রাম খুব মিস করছিলাম। গ্রামে খেলাধুলা করার সাথীদের অভাব নেই। যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারতাম। কোনো বাঁধা নেই গ্রামে। কিন্তু ঢাকায় এরকমটা নেই। বাসা থেকে বের হতে চাইলে কেউ বের হতে দেয় না। কিন্তু এভাবে আর পারি না। মুক্ত পাখিকে যেমন খাঁচাবন্দী করলে খাঁচাছাড়া হতে চায়, আমার অবস্থাও তেমন। আমি বাড়ি যাওয়ার জন্য কান্না শুরু করলাম। দুইদিন এভাবে কাঁদতে কাঁদতে কেটে গেল। তারপর ফুফির বাসায় পাশের বাসা থেকে একটা মেয়ে এলো। আমার চেয়ে দুই-তিন বছরের বড় হবে। মেয়েদের প্রতি তখন আমি খুব লজ্জাশীল ছিলাম। মেয়েদের সাথে খুব একটা কথা বলতাম না। এজন্য আমার কোনো মেয়ে বন্ধু ছিল না। এমনকি স্কুলেও আমার কোনো মেয়ে বন্ধু ছিল না। যাই হোক সেই মেয়েটির সাথে কথা বলে তাকে বন্ধুসুলভ মনে হলো। এদিকে আমারও একটা খেলার সাথী দরকার। তাই লজ্জাকে দূরে ঠেলে তার সাথে এক প্রকার ভাব জমে উঠল, মানে বন্ধুত্ব।
Image Source
সারাদিন দুজন সবসময় একসাথে খেলতাম। সেদিন থেকে ফুফির বাসা আমার খুব ভালো লাগতে শুরু করল। আমরা খাবার খেতাম একই সাথে। আমি খাবার না খেলে সেই মেয়েটিও খেত না। সন্ধ্যার সময় আমরা লুকোচুরি খেলতাম। মাঝে মাঝে তার সাথে পুতুল খেলার অভিজ্ঞতাও ছিল। সাতদিন ফুফির বাসায় কাটানোর পর দাদা-দাদি বলল যে কাল বাড়ি ফিরবে। শুনেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটিকে গিয়ে বললাম যে আমরা কাল বাড়ি ফিরব। শুনে মেয়েটির মন খারাপ হয়ে গেল।
-তুমি বাড়ি গেলে আমার সাথে ফেলবে কে?
-জানি না।
-তুমি এখানেই থেকে যাও। আমরা একসাথে খেলব সবসময়।
-সেটা কেউ শুনবে না। আমি আবার আসব।
-যাও। আমার সাথে আর কথা বলতে এসো না।
সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারলাম না। পরদিন দাদা-দাদির বাসস্ট্যান্ডে গেলাম বাসের জন্য। সঙ্গে ফুফি আর সেই মেয়েটিও ছিল। একটু পর বাস আসল। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আবার এসো।" আমরা বাসে উঠলে বাস ছেড়ে দিল।
বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম সেই মেয়েটির দিকে।
Image Source
আস্তে আস্তে আড়াল হয়ে গেল তার সেই মুখ। বাড়ি ফিরে বারবার মনে পড়ে সেই মেয়েটিকে।
সেই বছর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে আব্বু বলল ঢাকা যাবে ফুফির বাসায় বেড়াতে। আমি শুনে তো মহা খুশী। সেই মেয়ের সাথে আবার দেখা হবে। আব্বু আগামিকালের বাসের টিকেট কাটলেন। সারারাত সেই মেয়েটির কথা ভাবতে ভাবতে রাত কেটে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে রেডি হয়ে বাসস্ট্যান্ডে গেলাম। গিয়ে দেখি বাস দাড়িয়ে আছে। আমরা বাসে উঠে পড়লাম। একটু পর বাস ছেড়ে দিল। এবার রাস্তায় আর গতবারের মতো অতোটা জ্যাম নেই। ৩–৪ ঘন্টার মধ্যে মহাখালী পৌছে গেলাম। বাস থেকে রিক্সা করে ফুফির বাসায় গেলাম। ফুফির বাসায় গিয়ে ফুফিকে জিজ্ঞাসা করলাম সেই মেয়েটির কথা। তারপর ফুফি বললেন যে ওরা নাকি বাসা বদল করে অন্যত্র চলে গেছে। এটা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।
Image Source
এক নিমিষেই সব আনন্দ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দুচোখ ঝাপসা হয়ে এলো।