মাতৃ ভাষায় সাহিত্য চর্চা করা আমার কাছে আবশ্যকীয় একটি বিষয়। নিজ ভাষার সৌন্দর্য সম্পর্কে অবহিত হবার জন্য সাহিত্যে চর্চার তুলনা নেই। আমি তেমন কোন ভালো লেখক নই। শখের বসে একটু লেখা লেখি করি। তাও বলব না পুরোটা আমার সৃজনশীলতা। বিভিন্ন লেখকের বই পড়ে জ্ঞান আহরন করে লেখালেখি করি। নতুন কিছু সৃষ্টির চেষ্টা করি। আজকে আপনাদের কাছে আমার লেখা একটি ছোট গল্পের কিছু অংশ তুলে ধরছি।
বড় কর্মকর্তা কেউ আসার খবর হলেই অফিস সাফ করে ঝকঝকে পরিষ্কার করতে হয়- এ রীতি ব্রিটিশ আমলের। রীতিটা পাকিস্তান আমলেও বহাল ছিল, তা পাচার হয়ে এসেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের। মাঝখানে বিপদে পড়েছে মোহনপুর স্টেশন মাস্টার আব্দুর রউফ মুন্সী । পাকশী অফিস তো চিঠি দিয়েই খালাস যে, রেলের ডিজি জনাব খায়রুল বাসার খান আগামী ২৯ মার্চ মোহনপুর রেল স্টেশন পরিদর্শনে যাবেন। তাঁর থাকা ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করুন। চিঠি পেয়ে স্টেশন মাস্টার ট্রাঙ্ককল করে পাকশীতে। অনেক খুঁজে পাওয়া যায় এক সেকশনাল অফিসারকে। তাকে জিজ্ঞেস করে- হঠাৎ মোহনপুর কী এতাে বড় স্টেশন হয়ে গেল যে স্বয়ং ডিজি স্যার আসবেন এখানে?
সেটা আমাদের জন্য জরুরি নয়, উনি যাবেন এটাই জরুরি।
স্টেশনের যে অবস্থা তাতে বেইজ্জতি হওয়া ছাড়া কোন পথ থাকবে না। যাত্রী পার হওয়ার গেট ভাঙা, প্লাটফরমের অনেক ইট উঠে গেছে। এমন কী স্টেশনের নাম লেখা বাের্ডটিও ভেঙে পড়ে গিয়েছিল, বাজার থেকে জিআই তার এনে কোন রকমে বেঁধে রাখা হয়েছে।
আচ্ছা ঠিক আছে, একজন ঠিকাদার পাঠিয়ে দিচ্ছি সকালের ট্রেনে। তাকে দেখিয়ে দেবেন, সে সব ঠিকঠাক করে দেবে।
তা হলে ভালােই হয়। চাকরির শেষ দিকে আর বেইজ্জতি হতে ভালাে লাগে না।
আর একটা কথা।
কী?
উনি স্টেশনের ওয়েটিং রুমে থাকবেন।
বলেন কী?
হ্যা, এটাই উনার ইচ্ছা, আমাদের
জানিয়েছেন মাত্র।
কিন্তু এটা অসম্ভব!
কেন?
ওয়েটিং রুম বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ছয়/সাত বছর ধরে। দুই বছর আগে আমি চার্জ নেয়ার সময় খােলা হয়েছিল। ফ্যানগুলাে নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। টয়লেট খুলেই দেখিনি সেটা ঠিক আছে কি না? আর থাকবেন- খাট কোথায়? আমাদের ওয়েটিং রুমে তাে খাট থাকে না?
আপনার বাড়ি থেকে একটা খাট দিতে পারবেন না?
হা তা পারবাে।
তা হলে কোন অসুবিধা নেই, ঠিকাদারকে ওয়েটিং রুমের সমস্যা দেখিয়ে দেবেন, সে ঠিক করে দেবে।
আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এখানে তো ভালাে হােটেল নেই, খাওয়াবাে কী?
আপনার বাসায় রান্নার ব্যবস্থা করতে পারবেন না? অফিস বিল দেবে।
কিন্তু অতাে বড় সাহেবের রান্না...
আচ্ছা ঠিক আছে, এখান থেকে বাবুর্চি আগের দিন পাঠিয়ে দেবাে, আপনি শুধু জিনিসপত্র জোগার করুন।
তা পারবাে। এখানে বিলের টাটকা মাছ আছে, ভালাে দুধ পাওয়া যায়। ঘরে পাতা দই ব্যবস্থা করা যাবে। তবে ফলটল আনতে হবে সেই উল্লাপাড়া বাজার থেকে।
আনবেন।
ঠিক আছে, তা হলে কাল সকালে ঠিকাদার পাঠিয়ে দেবেন।
আরো একটা কথা আছে।
আবার কী?
মােহনপুর স্টেশনে একজন পয়েন্টস ম্যান ছেলের, নাম হাসেমউদ্দিন। বছর দুই আগে পেনশন পেয়েছে। সে নাকি ডিজি সাহেবের পরিচিত, তাকে খুঁজে বের করতে হবে।
তাকে আবার কোথায় পাবাে?
ধুর মিয়া। আপনি তো সবটাতেই বলছেন, এটা অসম্ভব, ওটা করবাে কী ভাবে। খুঁজে বের করুন হাসেমউদ্দিনকে।
জী স্যার।
ফোনটা রেখে দেয় ওপাশ থেকে। স্টেশন মাস্টার আব্দুর রউফ মুন্সীও রিসিভার রেখে দেয়। আর ভাবতে থাকে, মাত্র সাত/আট দিনের মধ্যে এতগুলাে কাজ কী ভাবে সম্ভব! ছােট্ট রেলস্টেশন লাহিড়ী মােহনপুর। অনেকেই বলে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ এলাকায় এসে চারণভূমি দেখে মুগ্ধ হন। নিয়ে আসেন বেশ কিছু বিদেশি জাতের গরু। তাদের বংশ বিস্তারে এ অঞ্চল গাে-সম্পদে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুধ প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বসানাে হয় ফ্যাক্টরি । ইংরেজরা রেল লাইন রেল লাইন বসানাের সময় স্টেশন স্থাপন করে। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে এক সময় বন্ধ হয়ে যায় ফ্যাক্টরি। কমে যায় স্টেশনের গুরুত্ব, পাশাপাশি জৌলুসও। তাই তাে স্টেশনে মেল বা আন্তঃনগর ট্রেন আর দাঁড়ায় না, সারাদিনে দাঁড়ায় দুটি লােকাল ট্রেন।
হাসেমের মনে পরে, মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম যে দিন এ লাইনে ট্রেন চালু হয় সেদিন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা সবাই এসেছিল স্টেশনে। সঙ্গে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নেতা আব্দুল ওয়াহেদ। স্টেশনে ট্রেন থামতেই হাত তালি দিয়েছিল ওরা, উত্তর দিয়েছিল যাত্রীরাও হাত তালি দিয়ে। পরের দিনও এসেছিল ওরা। ট্রেন থামতে নেমে আসে টিটি সাহেব। ওয়াহেদ তাকে জিজ্ঞেস করে কী ভাই আপনার ট্রেন কেমন চলছে?
ভাই, কেউ টিকিট কাটতে চায় না।বলেন কী? কেন?
সবাই বলে, স্বাধীন দেশের ট্রেনে টিকিট লাগবাে ক্যান?
দাঁড়ান দাঁড়ান, এই নু যাই তো দেহি। কেউ কেউ ভাবে, যাত্রীদের সঙ্গে মারামারি করে টিকিট কাটাবে না কি?
তবুও ওয়াহেদের পিছে পিছে গিয়ে একটি বগিতে উঠে পড়ে সবাই। যাত্রীদের অনেকেই ওয়াহেদকে চেনে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে। বগিতে উঠে সে যাত্রীদের বলে- আপনাদের কিছু কথা বলতে চাই।
হ্যা হ্যা বলেন। যাত্রীরা বলে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধে জনগণের ভূমিকার প্রশংসা করে ওয়াহেদ বলে- দেশ এখন স্বাধীন হয়েছে। এ দেশ আপনাদের। আপনার
যেভাবে দেশ চালাবেন সে ভাবেই চলবে। এ ট্রেন দেশের সম্পদ, মানে আপনার সম্পদ। এটা আপনাদের ইচ্ছা অনুযায়ী চলবে। আপনারা ইচ্ছে করলে ট্রেনের টিকিট কেটেও চড়তে পারেন, না কেটেও চড়তে পারেন। কিন্তু টিকিট না কেটে ট্রেনে চড়লে রেলের লােকসান হবে। আর লােকসান দিতে দিতে একদিন এই ট্রেন বন্ধ হয়ে যাবে। আপনারা কি চান যে আপনাদের দেশের ট্রেন বন্ধ হয়ে যাক?
না আমরা তা চাই না।
আর যদি আপনারা ট্রেনের টিকিট কেটে চলাচল করেন, তা হলে সেই টাকায় নতুন নতুন ইঞ্জিন, বগি এ সব কেনা হবে। এই লক্কড়ঝক্কড় ট্রেন আর থাকবে না। সেখানে আসবে নতুন নতুন ট্রেন। আপনাদের আর ঠাসাঠাসি করে ট্রেনে চড়তে হবে না। আরামে আপনারা গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন। এখন বলুন, আপনারা কী ভালাে ট্রেনে চড়তে চান?
হ্যা, আমাদের দেশে ভালাে ট্রেন চাই। এ জন্য টিকিট কেটেই ট্রেনে চড়বো। তা হলে এই স্টেশন থেকেই যার যার টিকিট কেটে নিন। যাত্রীরা সবাই ট্রেন থেকে নেমে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে টিকিট কাটতে সাহায্য করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার তারা লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রেনে উঠে পড়ে। এ ব্যবস্থায় খুশি হয় টিটি, গার্ড- সবচেয়ে বেশি স্টেশন মাস্টার। কারণ তার স্টেশনে এতাে টাকার টিকিট কোন দিনই বিক্রি হয়নি। খুশি হয় যাত্রীরাও, ট্রেনের টিকিট কিনে তারা যেন তাদের স্বাধীন দেশ গড়ায় অংশ নেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও শুরু হয় দেশ গড়ার উৎসব। তারা প্রতিদিন আসতে থাকে স্টেশনে। যাত্রীদের সহযােগিতা করতে থাকে টিকিট কাটা, মালপত্র ওঠানাে নামানাে থেকে অন্যান্য কাজে। এক সপ্তাহের মধ্যে অনেকটা শৃঙ্খলায় চলে আসে ট্রেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেই যাত্রীরা টিকিট দেখিয়ে বলে- টিকিট কাটছি ভাই, দেশ গড়ছি। জয় বাংলা।
To be continued.......
I am Sakeeb Ul Islam Sony, from Bangladesh. I am doing graduation in Disaster Management and Vulnerable Studies from Dhaka University . I love to travel and watch movies. Most of time of holidays I try to enjoy playing games and sports and watching movies.