Source: imdb
কিছু সিনেমা গল্প বলে তার ক্যামেরা আর মিউজিকের মাধ্যমে। প্যারিস, টেক্সাস সিনেমাটা নিশ্চিতভাবেই এই ক্যাটাগরিতে পড়বে। এই সিনেমায় কথার চেয়ে কাজ বেশি। চোখ আর কানের শান্তি চাইলে এই সিনেমা হবে আপনার জন্য বুফে ডিনার। ১৯৮৪ সালে রিলিজ হওয়ার পর থেকে যুগে যুগে বহু সিনেমাবোদ্ধা আর সিনেমাপ্রেমীর প্রিয় সিনেমার লিস্টে রয়ে গেছে এই সিনেমা।
প্রথমেই বলে নেই যে এই সিনেমা ১৯৮৪ সালের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাম ডি’অর পেয়েছিল।
সিনেমা শুরু হয় কালোর উপর লাল লাল অক্ষরে লেখা নাম দিয়ে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যেন কানে মধু ঢেলে দেয়। এরপর পর্দায় ভেসে ওঠে আমেরিকার বিস্তীর্ণ নির্জন পাথুরে এলাকা। কোথাও কেউ নাই। ক্যামেরা আসমানে ভেসে ভেসে আমাদের নিয়ে যেতে থাকে… হটাত দেখি এক লোক নির্জন প্রান্তর ধরে হেঁটে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়লো! ইনিই আমাদের এই সিনেমার প্রধান ব্যক্তি-হ্যারি ডিন স্ট্যানটন।
এই ক্লান্ত, বিধ্বস্ত লোকটিই হ্যারি ডিন স্ট্যানটন
Source: imdb
চুপচাপ আপাত বোবা লোকটির এই ছবিতে নাম ট্রাভিস, চার বছর ধরে নিখোঁজ। কেউ জানে না সে কোথায় আর কেনই বা হারিয়ে গেল! ব্যাটা শুধু হাঁটে। যেন কোথাও যাওয়ার খুব তাড়া। কিন্তু কোথায় যে যেতে চায় নিজেও জানে না। চরম গরমে অস্থির হয়ে পানির শেষ ফোঁটাটুকু পান করে সে এক পাবে যায়, পাবে গিয়ে তৃষ্ণার ঠেলায় বরফ গিলে উপুড় হয়ে পড়ে যায় মেঝেতে, এক ডাক্তার তাকে উদ্ধার করে সেবাশুশ্রুষা করে সুস্থ করে তোলে। পকেটে পাওয়া কার্ড দেখে ফোন করে জানতে পারে ওটা ওর ভাই ওয়াল্টার এর নাম্বার। ফোন পেয়ে ওয়াল্টার আর দেরি করে না। সোজা চলে যায় ভাইকে আনতে। কিন্তু এসে শোনে ভাই ভেগেছে!
আটান্ন বছর বয়সে হ্যারি ডিন স্ট্যানটন একটা গুরুত্বপূর্ণ রোল পেলেন! এর আগে তিনি শাহীন আলম বা মেহেদীর মতো সাইড নায়কের পার্ট করতেন শুনেছি। এই ভদ্রলোকের চোখ-মুখের ভাব দেখলে মনে হবে এই লোক কোন কথা না বললেও কাহিনী বুঝতে কোনো অসুবিধা হবে না, এতোটাই জীবন্ত এঁর অভিনয়। এই সিনেমার পারফর্ম্যান্সই জনাব হ্যারি ডিন স্ট্যানটন এর সবচেয়ে প্রিয়। নির্ভানা ব্যান্ড এর কার্ট কোবাইন এর অলটাইম ফেভারিট ছবি এটা। শুধু তাই নয়, এটা আকিরা কুরোসাওয়ারও অন্যতম প্রিয় ছবি।
এই ছবি প্রিয়জন হারানোর ছবি। আবার প্রিয়জনকে ফিরে পেয়েও ধরে রাখতে না পারার ছবি। এই ছবি আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায় আমাদের আসল ঠিকানা কোথায়। ছবির নামটা বেশ কৌতুহল জাগায় মনে। প্যারিস – স্বপ্ন আর রোমান্সের শহর, অন্যদিকে টেক্সাস – বিশাল, বিস্তীর্ণ নিঃসঙ্গ জায়গা। এই দুই বিপরীতমুখী জিনিসই এই সিনেমার মূল থিম বলে মনে হলো। সুখ আর দুঃখ যেন পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলে এখানে।
হ্যারি ডিন স্ট্যানটন, ছবিতে যিনি ট্রাভিস, কেমন পারফর্ম করছে তা আপনি ছবি দেখার সময়ই বুঝতে পারবেন। এই নিয়ে আমি আর তেমন কিছু বলবো না। তবে আরেকজন আছেন যার পারফরম্যান্স আমি কোনোদিন ভুলবো না তিনি হলেন নাসতাসইয়া কিনস্কি, ছবিতে যার নাম জেইন (হ্যারির স্ত্রী)।
এই যে সেই ভদ্রমহিলা।
Source: imdb
তাকে শুরুর দিকে দেখা না গেলেও প্রায় শেষ দিকে তার এমন এক জীবন্ত পারফরম্যান্স আছে যা সিনেমার পর্দায় এক অন্যতম ইমোশনাল দৃশ্য হয়ে আজীবন জ্বলজ্বল করবে। আর দৃশ্যটি অত্যন্ত রিয়েলিস্টিকভাবে নেয়া হইছে। ভিম ভেন্ডার (পরিচালক) সাহেবকে যারা চেনেন তারা তো জানেনই তিনি কোন লেভেল এর পরিচালক। আর যারা চেনেন না তারা চিনবেন এই সিনেমার পর। বাদবাকি সবাই যার যার কাজ ঠিকঠাকই করেছেন বলে মনে হয়ছে আমার। পিচ্চি হান্টারও চমৎকার কাজ দেখিয়েছে। ছবিটা দেখার সময় আমার ছেলেরও বয়স হান্টারের সমানই ছিল। প্রথমবার একা দেখার পর দ্বিতীয়বার ছেলের সাথে দেখলাম।
এই যে ট্রাভিস এর সাথে তার পুত্র হান্টার।
Source: imdb
ছবিটির ভিজ্যুয়াল নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা ছিলো আউটস্ট্যান্ডিং! দৃশ্যগুলো যেন একেকটা পেইন্টিং! রবি মুলার এর নাম আমার স্মৃতিতে আজীবন রয়ে যাবে এমন সুন্দর পিকটোরিয়াল ল্যান্ডস্কেপ উপহার দেয়ার জন্যে।
আর মিউজিক? কোন এক ইন্টারভিউতে ভিম ভেন্ডার বলেছিলেন যে এই সিনেমা তৈরি হয়েছে ক্যামেরা আর গিটারের সাহায্যে! মানে এই সিনেমা আপনার চক্ষু আর কর্ণের জন্যে ট্রিট বলতে পারেন। বেশি আড়ম্বর নেই মিউজিক এর, তবুও যেন বহুদিন কানে লেগে থাকে। আর মিউজিক্যাল পিসগুলো ইন্সট্যান্টলিই করা হয়েছে সিনেমার রাফ কাট দেখে দেখে (ভাবা যায়)!
এই সিনেমা দেখা যেন অনেকটা ধ্যানে বসার মতো। হয় আপনার প্রথম মিনিট থেকেই ভালো লাগবে নয়ত একেবারে না। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। আমার ধারণা, এই সিনেমা খুব অল্পতেই একজনের মনের মেঘ দূর করে দিতে পারে। বার বার দেখার জন্যে ফিরে ফিরে আসবেন আপনি। যদি না দেখে থাকেন, দেরি না করে শুরু করে দেন। পরে আমাকে ধন্যবাদ দিয়েন।
#ParisTexas #WimWenders #RoadMovie #Drama #Family #Redemption #Loneliness #FatherSon #Love #CinemaClassic #ArtFilm #1980sFilm