“আমি চলচ্চিত্র নির্মাতা নই। আমি চলচ্চিত্র শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রি) অংশ নই। আমি শুধুই একজন মানুষ। আমি নিজে কীভাবে পৃথিবীটাকে দেখি সেটা দেখানোর একটা যন্ত্র, আমার কাছে, ক্যামেরা।”
Béla Tarr
শেষ করলাম Béla Tarr-এর Satantango। নোবেল পুরষ্কার ২০২৫ ঘোষণার সুবাদে সবাই এতদিনে নিশ্চ্যই জেনে গেছে লাসলো ক্রাসনোহার্কাই কে। তার লেখা উপন্যাস Satantango অবলম্বনে নির্মিত এই ছবি সম্পর্কে বহুদিন আগে থেকে জানলেও এর দৈর্ঘের কারনে এতোদিন ধরার সাহস হয় নাই। এবার নোবেল পুরষ্কার ঘোষণার পর ভাবলাম, নাহ্, এনাফ ইজ এনাফ, এবার বই না পড়লেও সিনেমাটা দেখাটা ফরয হয়ে গেছে। তো এই সিনেমাটারে আমি সবার মতো করে জাস্ট সিনেমা বলতে চাই না, এইটা হলো একটা জার্নি, একটা অভিজ্ঞতা। প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা সময় লাগছে দেখে শেষ করতে (৭ ঘন্টা ১৯ মিনিট), কিন্তু শেষ করার পর মনে হলো প্রতিটা মিনিট, প্রতিটা দৃশ্য, ক্যামেরার প্রতিটা মুভমেন্ট মূল্যবান ছিল।
হাঙ্গেরীর কমিউনিস্ট পতন পরবর্তী সময়ের একটা গ্রামের গুটিকয়েক মানুষদের নিয়ে সিনেমাটা। যেখানে সুদিনের আশায় গ্রামের মানুষ বিশ্বাস আনে এক মেসায়াহ এর উপর যে কি না আসলে সরকারের এক চর। কিন্তু তার জাদুকরী অভিনয় আর বাচনভঙ্গি দেখে কার সাধ্য আছে যে বুঝেতে পারবে! সিনেমার পুরো সময়টা জুড়ে ছিলো এক ধরনের ভারী নীরবতা, বৃষ্টি, কাদা আর মানুষের মধ্যে জমে থাকা ভয়, অনিশ্চয়তা আরও কত কি যে ছিল তা বেলা টার, আর ক্রাসনোহোরকাই বলতে পারবে। তো যাই হোক, আমাদের সেই মেসায়াহ এর নাম Irimias— এই ক্যারেক্টারটা আমাকে পুরো মোহগ্রস্ত করে রাখছিল যতক্ষণ সে স্ক্রীনে ছিল। এই লোক এত চমৎকার অভিনয় যে করছে শুধু তা-ই না, এই সিনেমার মিউজিকও তার করা। আর মিউজিক এর কথা কী বলবো! গভীর রাতে কানে হেডফোন গুজে যদি ছবিটা দেখেন তাহলে বুঝবেন এর সুরের জাদু!
আরও দুজন ক্যারেক্টারের কথা বলা যায়- একজন হলেনঃ ডাক্তার, আরেকজন হলো পিচ্চি এস্টিকে। যা অভিনয় করলো দুজন! ডাক্তারের কাজকর্ম দেখতে গিয়ে মাঝে মাঝে অস্বস্তি হতে পারে। ওর বিশাল শরীর নিয়ে নড়তে চড়তে খুব অসুবিধা হচ্ছিলো আর ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস এর শব্দে মনে হবে ধুর টেনে দেই। কিন্তু ভুলেও এই কাজ করতে যাবেন না। ডাক্তার আমাকে বেশ খানিক্ষণ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
এই হলো সেই ডাক্তার। Source: Imdb Link: https://www.imdb.com/title/tt0111341/mediaviewer/rm1157271553/
আর এস্টিকে তার ভাই এর সাথে মিলে টাকার গাছ লাগাতে যায়। ব্যাপারটা আমার কাছে খুব ইউনিক লাগছে। ওর একটা বেড়াল আছে। সেই বেড়ালের সাথে সে এক পর্যায় রীতিমতো কুস্তি করে। কুস্তি দেখার সময় আমার বার বার দম আটকে আসছিল এই ভেবে না জানি কখন মেয়েটাকে আঁচড়ে দেয়! এত রিয়েলিস্টিক কি যে বলব!
আর ইনি হলেন এস্টিকে। Source: Imdb Link: https://www.imdb.com/title/tt0111341/mediaviewer/rm536514561/
এই সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি দেখার মতো। ফিল্মটা যদিও সাদাকালো, তবে সাদাকালোটা এই সিনেমার বিষয়বস্তুর জন্য এসেনিশিয়াল ছিল।
এরকম ধূ ধূ মাঠ এই সিনেমার কমন দৃশ্য। Source: Imdb Link: https://www.imdb.com/title/tt0111341/mediaviewer/rm1627033601/
সব কিছু এত রিয়েলিস্টিক যে বোঝার কোনো উপায় নাই যে এটা সিনেমা। বেলা টারের ক্যামেরায় যেন জাদু আছে। বেলা টার বলেন যে তিনি সিনেমা সেভাবেই তৈরি করেন যেভাবে তিনি জগতটাকে দেখেন। তাই তার একেকটা শট এর দৈর্ঘ হয়ে যায় ৮/১০ মিনিট। সিনেমার শুরুই হয় ৮ মিনিট দীর্ঘ এক শট দিয়ে যেখানে দেখানো হয় একটা ডেসোলেট গ্রাম, যে গ্রামে বেশ কিছু গরু হাম্বা হাম্বা করে চরে বেড়াচ্ছে। সিনেমাটা দেখতে গিয়ে বার বার মনে হচ্ছিলো যেন আমিও এই সিনেমার ভেতরেই আছি। Irimias আর Petrina দের সাথে রাস্তায় হাঁটতেছি আর রাস্তার সমস্ত ময়লা আবর্জনা আমার চারপাশ থেকে উড়ে উড়ে যাচ্ছে। হাঁটা, বাতাস, ঘন্টার শব্দ-সবকিছুই এমনভাবে দেখায় যে মনেই হয় না সিনেমা দেখতেছি।
এই সিনেমা দেখে বুঝলাম, সিনেমা মানে শুধু গল্প বা বিনোদন না—সিনেমা একটা অনুভূতি। ধৈর্য নিয়ে দেখতে পারলে বেশ রিওয়ার্ডিং একটা ব্যাপার হতে পারে।
তারকোভস্কি, বেলা টার, কিয়ারোস্তামি—এই তিনজনের সিনেমা দেখার পর মনে হচ্ছে আমার ভেতরের যে দর্শকটা ছিল সে আর আগের মতো নাই, একদম বদলে গেছে। এখন আর সিনেমায় বিনোদন খুঁজি না, খুঁজি জীবন।
লঙ লিভ সিনেমা...