বাংলা শব্দে বহুল ব্যবহৃত দুই অক্ষরের একটা শব্দ আছে। অনেকে বলে এটাকে গাছ অনেকে বলে ঘাস। আর সেটা হচ্ছে বাঁশ। বাঁশ খাইলাম, বাঁশ নিলাম, বাঁশ দিলাম এই ধরণের শব্দে ছেয়ে আছে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়। এই বাঁশ ব্যবহার না করলে আমাদের চলেই না। ঠাট্টা ইয়ার্কি মস্করায় বাঁশ, বন্ধ বান্ধবদের আড্ডায় বাঁশ, ঝগড়া ঝাটিতে বাঁশ, ব্যবসা বানিজ্যে বাঁশ, এমনকি রেল লাইন, সরকারী বহুতল ভবন ব্রিজ কালভার্টেও রডের বদলে বাঁশ। সর্বত্রই বাঁশ। কেউ কাউকে বাঁশ দেয় আবার কেউ কারো কাছে বাঁশ নেয় আবার এই বাঁশ লেনদেনে তৃতীয় পক্ষের বিনোদনের খোরাক হয়।
অবশ্য আমাদের এই উঠতে বসতে বাঁশ নেওয়ায় অভ্যস্ত। বাঁশ নেওয়াটা যেমন অভ্যস্ত ঠিক তেমনি বাঁশ দেওয়াটাকেও আমরা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছি। তেমনি আজ সিজানও বাঁশ নিল।
এক বন্ধুর সন্তান হয়েছে, কন্যাসন্তান। দেখতে যাওয়ার দরকার। এমন সুখের দিনে যদি বন্ধুর পাশে না দাঁড়াই তাহলে বন্ধুরে খসাবে কেমনে। কিন্তু খালি হাতে তো যাওয়া ঠিক হবে না। কিছু পোষাক নিয়ে তারপর যাওয়া যায়। জিরো সাইজের দুটি কাপড় নিল। একটা পাঞ্জাবী নিজের জন্য পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু পাঞ্জাবী নিয়ে গেলে নিশ্চিত কপালে শনি আছে। মায়ের একটা মাইর ও মাটিতে পরবে না। এক বছর আগের একটা পাঞ্জাবীর পিস এবার সেলাই করেছে। আরেকটা পাঞ্জাবীর ভাঁজ পর্যন্ত খোলা হয় নিই। সেলসবয় বললো স্যার কাউন্টারে যান আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
কাউন্টারে গিয়ে রিসিট দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খায়। আমি পাঞ্জাবী নেই নিই তো মাত্র দুটা জিরো সাইজের পোশাক নিয়েছি। জি জিরো সাইজের পোষাকের মূল্যই এটা। আন্ডার গার্মেন্টসের চেয়েও ছোট ছোট দুটা পোশাকের এত্তো দাম। আল্লাহই জানে লোকে বাচ্চা পালে কেমনে। বিয়ে করার সখটা এখানেই অবদমিত হয়ে গেল।
সিজান বির বির করে বলছিল, বাচ্চা পয়দা করার আগে আমাদের মত বেকার বন্ধুদের নিয়ে একবার অন্তত ভাবার দরকার ছিল তার। ম্যানেজার বেটার কান খুব খাঁড়া, বলে স্যার আসলেই ওনারা বাচ্চা না নিলে আমাদের বাচ্চারা খাবে কি? নিতে দিন, বরং বেশি বেশি করে বাচ্চা নিতে উৎসাহ দিন।
বন্ধুর মেয়ের নাম সিন্থিয়া, বিয়ের পাঁচ বছর আগেই নাম ঠিক করে রেখেছিল ছেলে হলে নোয়ান, মেয়ে হলে সিন্থিয়া। আমি অবশ্য সিন্থিয়ার চাচ্চু মামা দুটাই হব। এইজন্য আমার খুশিও ডাবল। ক্লাস নাইন হতেই প্রেম। স্কুলের বারান্দায় যখন আমরা ছেলে মেয়ে গ্রুপ হয়ে বিভিন্ন খেলা খেলতাম তখন থেকেই তারা প্রেমের খেলায় ডুবে ছিল একে অপরে। অবশ্য এটা সবাই জানতে পারে কলেজে উঠার পর।
অনেক চোরাই উতরাই পার করে দির্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে দুই বছর হল বিয়ে করার। কত না বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে পরিবারের শত বাঁধা ডিঙ্গিয়ে তাদের এই সম্পর্কের চুড়ান্ত সফলতা বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। তারা দুজনেই বন্ধু ও বান্ধবীদের কম জ্বালায় নিই এই সম্পর্কের জন্য। তারপরেও সকল বন্ধুরাই তাদের বিয়েতে প্রচন্ড খুশি। পালিয়ে গিয়ে সব চেয়ে বেশি বিপদে ফেলেছিল সিজানকেই। এই বাঁশটি ছিল সবচেয়ে যন্ত্রনাদায়ক। অপহরণ মামলা পর্যন্ত গড়ায়। একবার মেয়ের পরিবার এক বার ছেলের পরিবার আর একবার পুলিশের প্যারা। এইসবের কারনে বাসায় উত্তম মাধ্যম তো কম ক্ষেতে হয় নিই। এক সপ্তাহ বাসা থেকে বার হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল।
যাই হোক চাচ্চু আবার মামা হওয়ায় খুব উৎফুল্ল মনে পোষাকের ব্যাগ হাতে নিয়ে বন্ধুর কাছে গেলে তার চেহারা মলিন হয়ে আছে। অশ্রুশিক্ত নয়নে কেমন যেন অসহায়ের মত ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে আছে। কিরে বাপ হয়ে গেলি বলে তার কাঁধে হাত দিয়ে একটা নাড়া দিতেই মনে হল তার শরীরের সব গুলো হাড়া খসে পরেছে। আস্ত একটা জাঁদরেল দেহ যেন ভিতর থেকে ফাঁপা হয়ে আছে।
সিন্থিয়ার মা মনীষা ভালো নেই। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে চলেছে। তাকে শান্তনা দেওয়ার মত একটি শব্দও বার হচ্ছিল না মুখ দিয়ে। মনে হচ্ছিল বোবায় ধরেছে। সিজান এই প্রথম বারের মত কাউকে হাড়ানোর কষ্ট অনুভব করতে শুরু করলো। সিন্থিয়াকে সিজানও স্কুল থেকেই প্রচন্ড ভালো বাসতো। কিন্তু প্রকাশ করার আগেই সে অন্য কারো হয়ে যায়। কিন্তু সিন্থিয়ার প্রতি তার যে এতোটা ভালোবাসা ছিল সে নিজেও এর আগে কখনো অনুভব করতে পারে নিই।