অধিকাংশ ফুটবল সাপোর্টারদেরই কেউ না কেউ আইডল থাকে,যাঁরা ফুটবলকে আমাদের অন্তর দিয়ে ভালোবাসতে শেখান।এমন কিছু নাম বললে তালিকার শুরুতেই হয়তো লিওনেল মেসি,ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো,ম্যারাডোনা,কাকাদের নাম আসবে।কেউ কেউ ক্রিশ্চিয়ানোকে পছন্দ করেন তাঁর অ্যাক্রোবেটিক গোলস্কোরিং অ্যাবিলিটির জন্য।আবার অনেকে মেসিকে পছন্দ করেন তাঁর স্পেশাল সলো রানগুলোর জন্য।তবে আজ এমন একজনকে নিয়ে কথা বলবো যাঁর মধ্যে অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো একাধারে সলো রান নিয়ে ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং দেওয়ার,ফুটবল প্রতিভা নিয়ে জিতে নিয়েছেন সব ফুটবলপ্রেমীদের মন।
Image source
রোনালদো ডি এসেস মোরেইরা
সময়টা ২০০৩।ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা ডেভিড বেকহামকে দলে ভেড়ানোর জন্য লড়াইয়ে নামে দুই স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা।তবে শেষ-মেষ রিয়াল মাদ্রিদই সফল হয়।এদিকে বার্সা প্রেসিডেন্ট লাপোর্তে বেকহামকে না পেয়ে পিএসজি থেকে উড়িয়ে আনেন একজন গ্ল্যামারহীন খেলোয়াড়কে,পরবর্তীতে মেসি যাঁকে নিয়ে বলেছিলেন,
"He was responsible for the change in Barca.It was a very bad time and the change that come about with his arrival was amazing."
হ্যাঁ,কথা বলছি রোনালদিনহোকে নিয়ে।
রোনালদিনহোর আসল নাম রোনালদো ডি এসেস মোরেইরা।তাঁর নাম রোনালদিনহো হওয়ারও একটি মজার কাহিনী আছে।দিনহো যতগুলো বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন সবগুলো দলেই তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।তার টিমমেটরা তাঁর নাম দেয় রোনালদিনহো।রোনালদিনহো অর্থ ছোট রোনালদো।তখন ব্রাজিলে রোনালদো নাজারিওর রাজত্ব।ফলে তাঁর নাম হয়ে যায় রোনালদিনহো।১৯৮০ সালের ২১ মার্চ ব্রাজিলের পোর্ট অ্যালেগ্রি শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।ব্রাজিলের অধিকাংশ পরিবারের মতোই তিনিও ফুটবলীয় পরিমন্ডলেই বড় হচ্ছিলেন।তাঁর বাবা জোয়াও ডে এসেস মোরেইরা স্থানীয় ক্লাবের হয়ে পেশাদার ফুটবল খেলতেন।তবে কিছুদিন পর ফুটবল ছেড়ে শিপইয়ার্ডে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ নেন।তবে বড় ভাই রবার্তো প্রফেশনাল ফুটবল খেলতেন।দিনহোও মাত্র ৭ বছর বয়সে অর্গানাইজড ফুটবল খেলা শুরু করেছিলেন।
৮ বছর বয়সে রোনালদিনহোর বাবা মারা যান।একই সময়ে ভাই রবার্তো ব্রাজিলিয়ান ক্লাব গ্রেমিও'র সাথে প্রফেশনাল কন্ট্রাক্ট সাইন করে।কিন্ত বেশিদিন খেলতে পারেননি,ইনজুরিতে থেমে যায় রবার্তোর ক্যারিয়ার।
Image source
ছোট্ট রোনালদিনহো
দিনহো প্রথম আলোচনায় আসেন ১৩ বছর বয়সে।স্থানীয় একটি ক্লাব আরেকটি ক্লাবকে হারায় ২৩-০ ব্যবধানে এবং ২৩ টি গোল রোনালদিনহো একাই করেন।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে ডাক পান U17 Youth World Cup ব্রাজিল দলে।সেবার ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়,দিনহো জিতে নেন ব্রোঞ্জ বল।
১৯৯৮ সালে ১৮ বছর বয়সী দিনহোকে সাইন করায় গ্রেমিও।কোপা লিবারতোদেরেসে অভিষেক হয় তাঁর।সেখানে তিন সিজনে ১৪৫ অ্যাপিয়ারেন্সে ৭২ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করেন তিনি।
এসময়ে তিনি ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পান।সেবার কোপা আমেরিকা জেতে ব্রাজিল।একই বছর ফিফা কনফেডারেশনস কাপে সৌদি আরব কে ৮-০ তে হারায় ব্রাজিল,সে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন দিনহো।সেই টুর্নামেন্টে ব্রাজিল রানারআপ হলেও রোনালদিনহো গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন বুট জিতে নেন।
Image source
জাতীয় দলে রোনালদিনহো
এরপর সময় আসে ইউরোপ যাত্রার।২০০১ সালে 5M £ অর্থমূল্যে যোগ দেন পিএসজিতে।সেখানে প্রথম সিজনে কিছুটা নিষ্প্রভ থাকলেও জ্বলে ওঠেন পরের সিজনেই।পিএসজিতে দুই সিজনে ৮৬ অ্যাপিয়ারেন্সে ২৫ গোল ও ১৮ অ্যাসিস্ট করেন।
Image source
পিএসজিতে রোনি
ক্রমেই এগিয়ে আসে ২০০২ বিশ্বকাপ।সেবারের ব্রাজিল দলের কথা কারোই অজানা নয়!সেই ড্রিম টিমে "দিনহো-নাজারিও-রিভালদো" ত্রয়ী যেন ছিলো প্রতিপক্ষের কাছে ত্রাস!সেবার ব্রাজিলের ঐতিহাসিক 11 নাম্বার জার্সি পরে বিশ্বকাপ জেতেন রোনালদিনহো।
২০০৩ সাল।কাতালান ক্লাব বার্সেলোনার তখন খেইহারা অবস্থা।এমন সময় বার্সায় আসেন রোনালদিনহো।পরের গল্পটি শুধুই দিনহোময়!একের পর এক দলকে পায়ের জাদুতে করেছেন বিধ্বস্ত,দর্শকদের করেছেন বিমোহিত!২০০৪ সালে পারফরম্যান্সের দরুন জিতে নেন FIFA Best Player of The Year।২০০৫ সালটিকে রোনালদিনহোর ক্যারিয়ারের সেরা বছর বিবেচনা করা হয়ে থাকে।সেবছর ব্রাজিলের হয়ে কনফেডারেশনস কাপ জেতেন।১৯ নভেম্বর,২০০৫ এল ক্লাসিকো চলছে রিয়াল মাদ্রিদের হোমগ্রাউন্ড সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে।একের পর এক ডিফেন্ডারদের বিট করে ফাইনালি বিট করেন ইকার ক্যাসিয়াসকে।সে ম্যাচে ৩-০ তে জেতে বার্সা,দিনহো করেন দুটি গোল।সেদিন বার্নাব্যুর দর্শকদের কাছ থেকে স্ট্যান্ডিং এভিয়েশন পেয়েছিলেন দিনহো!রাইভালের মাঠে,রাইভালের দর্শকদের কাছে স্ট্যান্ডিং এভিয়েশন পাওয়ার চেয়ে সম্মানের আর কি থাকতে পারে?সে বছর ব্যালন ডি'অর জেতেন দিনহো।
Image source
বার্সেলোনায় রোনালদিনহো
২০০৬ সালে ডেকো-ইতোদের সাথে মিলে বার্সাকে জেতান ১৪ বছরের অধরা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফি।এরপর থেকেই তাঁর ক্যারিয়ার গ্রাফ ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে।২০০৮ সালে 6.5M £ তে এসি মিলানে পাড়ি জমান দিনহো।বার্সায় পাঁচ সিজনে ২০৭ অ্যাপিয়ারেন্সে ৯৪ গোল এবং ৬৯ অ্যাসিস্ট করেন।মিলানে ২০১১ পর্যন্ত খেলার পর যোগ দেন স্বদেশী ক্লাব ফ্লামেঙ্গোতে।এরপর কয়েকবছরে বেশ কয়েকবার ক্লাব পরিবর্তন করে অবশেষে ২০১৮ সালে অফিশিয়ালি রিটায়ারমেন্টের ঘোষণা দেন।
রোনালদিনহো ছোটবেলা থেকে বস্তিতে বড় হওয়ার ফলে সেখানে ঘাসে পরিপূর্ণ মাঠ ছিলো না।তিনি সমবয়সীদের সাথে বালিতে ফুটসাল খেলতেন।ফুটসালের সেই স্কিলগুলো পরবর্তীতে ফুটবলে প্রয়োগ করলে তাঁর খেলা অদম্য এবং আকর্ষণীয় হতে থাকে।ফ্লিপফ্লাপ ইলাস্টিকো,নো লুক পাস,ফেক ফ্রিকিকসহ বিভিন্ন স্কিল দিয়ে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছেন প্রতিপক্ষকে।তাঁর এমন দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের পেছনে তাঁর ভাই রবার্তোর যথেষ্ট অবদান ছিলো।দিনহো এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন,
"রবার্তো আমাকে জোর করতো যাতে আমি প্রতিবারে বল নিয়ে ৫০০ জাগল করি।সে দাঁড়িয়ে থাকতো এবং ৫০০ বার না হওয়া পর্যন্ত কখনোই যেতো না।এটা আমার জন্য মজার ছিলোনা,মাঝে মাঝে আমি কাঁদতাম।তবে ক্রমে পরে বুঝতে পারি সে আসলে কি চেয়েছিলো।"
রোনালদিনহোর খেলার মাধ্যমে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন প্রায় সবারই!
Image source
ব্যালন ডি'অর হাতে রোনালদিনহো
"I wanted to play against you just oncein my life,because you're the last person to give me hope for football."
-Diego Maradona
"The most important thing is to play with the champions,and Ronaldinho without doubt is one of them."
-Carlo Ancelotti
"Ronaldinho was virtually unstoppable at his best,as a forward or a playmaker."
-Sergio Ramos
দিনহোকে নিয়ে অসংখ্য এমন উক্তি আছে,সবগুলো লিখতে গেলে বই হয়ে যাবে!পৃথিবীতে অনে গ্রেট গ্রেট খেলোয়াড় আছেন।আরোও হয়তো আসবেন।তবে এই ভুবনভোলানে হাসির অধিকারী সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারকে বিশ্ব মনে রাখবে একজন ম্যাজিশিয়ান হিসেবে,দ্যা রিয়াল বিউটি অফ ফুটবল-রোনালদো ডি এসেস মোরেইরা,রোনালদিনহো!