আঁধার নামার সাথে সাথেই যেন কেমন একটা ক্লান্তি নেমে আসতে শুরু করে।আঁধারের ক্লান্তি।বাহ নামটা বেশ হলো তো!একা একা থাকার এই একটা সুবিধে।যখন তখন ভাবনার সাগরে ডুব দেয়া যায়।অসুবিধাও কম না।যত্তসব নিজের ভুলগুলো মনে পড়তে থাকে,আর সেগুলোর আরোও খারাপ পরিণাম কি হতে পারতো মাথায় ঘুরতে থাকে।একদম বিরক্তিকর। এই অবস্থা কাটানোর একমাত্র উপায় হলো বই পড়া। আমার বইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহটাও আমি এভাবেই সাজিয়েছি। বিভিন্ন বিষয়ের বই, সব একখানে; যেন চাইলেই পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে আমি নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে যাই। শেলফের কাছে গিয়ে এক হাত 'শেষের কবিতা', আরেক হাত কাজী নজরুলের 'সঞ্চিতা'য় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।
তবে এমন একাকিত্ব আমার সয়ে গেছে।আপাতত আমার চিন্তা কেবলই একজনকে নিয়ে,তিনি হলেন অনামিকা।অনামিকা হাসান।
আমি একা একা থাকি একটা বাসায়।লোকজন আসলেই বলে,'তোর বাসাটা তো বেশ গোছানো!' আমি হাসি।শেষবার বহুদিন আগে গুছিয়েছিলাম।আমি ঘরে থাকলে তেমন কিছু ওলটপালট হয় না।ঘুমোলে বিছানার চাদরটা পর্যন্ত না।টুকটাক ঝাড়ু দিয়ে দি,এই-ই!এজন্যই বোধহয় ঘরে আসলে কেমন একটা বিষন্নতা ভর করে।কেবল মনে হয়,'আহা,কতদিন ঘরটা এলোমেলো করা হয় না!' আবার গোছানোর কষ্টের কথা মনে করেই এলোমেলো করার সাহস হয়ে ওঠে না!
আমি সারাদিনই প্রায় বাহিরে থাকি।সন্ধ্যাবেলায় ঘরে এসে হাতমুখ ধুয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকা, একটু বই পড়া, পেপারওয়ার্ক করা, খবর দেখা, ভালো আর্টিকেল পেলে পেপারকাটিং করা। মাঝে মাঝে নিজের সাথে নিজেই বিতর্ক করা। বিতর্কের বিষয়গুলোও হয় বেশ মজার, আবার মাঝে মাঝে বেশ সিরিয়াস! যেমন পুতিন নাভালনীকে হাঙ্গার স্ট্রাইকে মেরে ফেললে যুক্তরাষ্ট্র কি করতে পারে?আবার মনে হয়,শেষের কবিতা একটা বোকা কাহিনী।তা না হলে,লাবণ্য সত্যিকার কেউ হলে অমিতের বারোটা বাজিয়ে দিতো!এইতো রুটিন!বেশ কয়েকদিন থেকে কাজের চাপ একটু কম।এ সময়ে অবশ্য রাতে ছাদে যাওয়ার অভ্যাস হয়েছে।প্রথমদিন এসে ভাবি,আরে,রাতে তো ভালোই বাতাস হয়!তারপর থেকে প্রায়ই আসা।আমার বাসাটা দোতলায়।বাসার সামনে একটা নারিকেল গাছ আছে।যখন চাঁদ ওঠে,তখন নারিকেল গাছের অন্ধকার পাশটার ওপারে চাঁদটা লুকোচুরি খেলে। ঠিক এমন সময় মনে হয়,আহ এক কাপ কফি হলে মন্দ হতো না। তবে সে শুধু মনে মনেই, নাহলে নিচে নেমে রান্নাঘরে ঢুকে কফি বানানোর ঝক্কি পোহাবে কে?
আমি পেশায় শিক্ষক। বেসরকারী কলেজে বাংলা পড়াই। অনেকের ধারণা, বাংলা হলো গুরুগম্ভীর কাঠখোট্টা সাবজেক্ট। এটা যারা পড়ে, তারাও নিরস। এজন্যই বোঝহয় কেউ আমার কাছে তেমন একটা ঘেঁষতে চায় না। আমিও তাতে বাধা দেই না,আমি আছি আমার জগৎ নিয়ে। এখানে আছেন সৈয়দ মুজতবা, শরৎবাবু, আনিসুল হক, জহির রায়হান, আরেক শিক্ষক হুমায়ূন, এমনকি অন্ধ কবি হোমারও আছেন। উপমহাদেশীয় হিসেবে প্রাচীন বেদব্যাসকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, তাঁকে খুজে পাওয়া যায় নি (মহাভারতের ১৮ খন্ড এখন সংগ্রহশালায় পুরতে পারি নি)। এঁদের নিয়েই বেশ ভালোই কাটে। মাঝে মাঝে ঝামেলা বাঁধান মাইকেল মধুসূদন।ফড়ফড় করে এমন এমন দু'তিনটে চরণ বলে ফেলেন, মর্মার্থ বের করা দায়। কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও বাংলা পড়তে অতটা আগ্রহী না। এ অবশ্য তাদের দোষ না।তবু মেজাজটা বিগড়ে যায় যখন শুনি,'গৃহদাহ' গল্পের বই। মনে মনে বলি,"ব্যাটা এমন চড় খাবি যে পরের বার শুধু 'গৃহ' বললেই বলবি উপন্যাস!" পরক্ষণেই আবার নিজে নিজেই হোহো করে হাসি।
কলেজে সময়টা ভালোই কাটে।ক্লাসের বকবকানি শেষে কমনরুমে কলিগদের সাথে আড্ডা, দুপুরে এদিক সেদিকে কোনমতে খেয়ে হেঁটে বেড়ানো। এই বদঅভ্যাসটা রপ্ত করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে। ভরদুপুরে যখন সবাই বিশ্রামে, তখন একাকী হাঁটতে বের হওয়া।হাঁটতে হাঁটতে পরিশ্রান্ত হয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে হাতমুখ ধুয়ে তারপর একটু বিরাম।
ও হ্যাঁ,অনামিকা।ওর সাথে আমার পরিচয় হয় ভার্সিটির লাইব্রেরিতে।তখন থেকেই আমার সংস্রবে খুব বেশি মানুষ ছিলো না।আমার চুল ছিলো কাঁধ পর্যন্ত,বেশ ঝাঁকড়া, মোটা ফ্রেমের গেল চশমা,খোঁচা দাড়ি।পরনে আধময়লা জিনস আর ফতুয়া।অন্যদিকে অনামিকা পরিপাটি উজ্জ্বলবর্ণা,টানা ভ্রু'র পটলচেরা চোখে চিকন ফ্রেমের চশমাপরা মেয়ে। ওর সাবজেক্ট কি ছিলো জানেন? মলিকিউলার বায়োলজি!
এমন কাঠখোট্টা সাবজেক্টের কারো সাথে আমি পরিচিত হবো কখনও ভাবিনি। কিন্তু হয়ে গেল। আমি বাংলায় পড়লেও আমার বিশেষ আকর্ষণ ছিলো হায়ারোগ্লিফিকস (প্রাচীন মিশরীয় লেখা ) ও এনসিয়ান্ট ইজিপ্ট নিয়ে। অনামিকার সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার কারনও ছিলো এটাই। ভাবতেই অবাক লাগে মলিকিউলার বায়োলজি পড়া একটা মেয়ের হায়ারোগ্লিফিকসে আগ্রহ থাকতে পারে!কি আশ্চর্য, ডিএনএ-আরএনএর কঠিন সব স্ট্রাকচার পড়েও ইতিহাস পড়ে। ধীরে ধীরে কথাবার্তা, রেফারেন্স বই আদান-প্রদান করতে করতে বন্ধুত্ব। প্রথম যেদিন আমরা ঘুরতে যাই, সেটা ছিলো পাহাড়পুর। পুরোন সভ্যতা, জাদুঘর ও স্থাপত্য এসবই ছিলো আগ্রহ। সোমপুর বিহারের বিশাল গাছের নিচে বসে অনামিকা যখন কথা বলছিলো, আমি ততক্ষণে আটকে গেছি আরেক জায়গাতে।অনামিকার ঠোঁটের একটু নিচের ছোট্ট তিলটায়।
ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি,
'প্রহরশেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস,
তোমার ঠোঁটের তিলেই হয়েছে আমার সর্বনাশ!'
সেই শুরু। আমি আর অনামিকা হাসান। কত দুপুর, কত সন্ধ্যা একসাথে। এইতো সেদিন ময়নামতিতে, ক’দিন পরে মহাস্থানগড়ে। কিন্তু বেশীদিন তার সান্নিধ্য আমি পাইনি। তিন বছরের মাথায় ও রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। চুপচাপ, একা একা ওর বাসায় গিয়ে শেষকৃত্য গিয়েছিলাম।
কিন্তু আমাকে পুরোপুরি ছেড়ে যেতে পারলে কোথায়?এই যে,আজ পূর্ণিমা।ছাদে তুমি,আমি আর চাঁদমামা।
এভাবেই তো বেশ আছি বটে!
Image source
Starry Night by Vincent Willem van Gogh.