"আয় আয় চাঁদমামা, টিপ দিয়ে যা" কিংবা "চাঁদের বুড়ির চরকা"সহ আরো কত রকমের গল্প, কবিতা, উপ্যাখ্যান আমরা হরহামেশাই শুনে থাকি। সুকান্ত বলে গেলেন, "পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি!" আবার প্রেমাষ্পদকে আধো রাতে মনে পড়লে খোলা বাতায়ন দিয়ে দেখা দেওয়ার আকুতিও প্রকাশিত হয় এই চাঁদ দিয়েই। সেই চাঁদ যেন তখনও অধরা, মানুষ যেন পৃথিবীকে জয় করেও ক্ষান্ত হয়নি। এবার তারা পাড়ি জমাতে চায় চাঁদে। যেই ভাবা সেই কাজ; বেশ কয়েকটি মহাকাশযান পাঠানো হলো। নাসা থেকে অ্যাপোলো ৮ এবং ১০ মিশন পাঠানো হলো, সেগুলো চাঁদকে প্রদক্ষিণ করেই ফিরে আসে। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি একটি নির্ধারিত জাতীয় লক্ষ্য় পূরন হয় অ্যাপোলো-১১ মিশনের মাধ্যমে।
Image source
চাঁদ ও পৃথিবী
অ্যাপোলো-১১ প্রথম মনুষ্যবাহী মহাকাশযান ছিলো, যেই মিশনে মহাকাশচারীরা চাঁদে নেমেছিলেন। এই মিশনে ছিলেন নীল আর্মস্ট্রং, এবং বাকি দুজন ক্রু ছিলেন এডুইন অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্স। মিশনটি লঞ্চ করা হয়েছিলো ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই। মিশন কমান্ডার নীল আর্মস্ট্রং এবং লুনার মডিউল পাইলট বাজ অলড্রিন ২০ জুলাই, ১৯৬৯ সালে প্রথম চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরন করেন। প্রথমে আর্মস্ট্রং চাঁদে অবতরন করেন এবং তার ১৯ মিনিট পরে তাঁর সাথে যোগ দেন। তাঁরা চাঁদের বুকে প্রায় এক ঘন্টার কাছাকাছি সময় কাটান। এসময় তাঁরা ৪৭.৫ পাউন্ড বা ২১.৫ কেজি 'লুনার ম্যাটারিয়েল' বা চাঁদের বস্তু সংগ্রহ করেন। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন প্রায় ২১ ঘন্টা ৩৬ মিনিট চাঁদে অবস্থান করেছিলেন।
Image source
লুনার মডিউল থেকে চন্দ্রপৃষ্ঠ
অ্যাপোলো-১১ লঞ্চ করা হয়েছিলো ফ্লোরিডার মেরিট দ্বীপে অবস্থিত কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে; একটি 'স্যাটার্ন ভি' রকেটের সাহায্যে। এটা নাসা পরিচালিত মহাকাশচারী অ্যাপোলো প্রোগ্রামের পঞ্চম মিশন। অ্যাপোলো মহাকাশযানটির তিনটি অংশ ছিলো। প্রথমটি ছিলো কমান্ড মডিউল যাতে তিন মহাকাশচারীর জন্য কেবিন ছিলো। এই অংশটি চাঁদের অরবিটে যাওয়ার পর অর্থাৎ স্যাটার্ন ভি'র তৃতীয় স্টেজ যখন নভোচারীরা লুনার অরবিটে পরিভ্রমন করছিলেন। চাঁদের বুকে আর্মস্ট্রংয়ের প্রথম পা ফেলার ঘটনাটি সারা বিশ্বে ব্রডকাস্ট করা হচ্ছিলো। পৃথিবীর অরবিটাল গ্রাভিটি বা মহাকর্ষীয় বল ছিন্ন করার জন্য অনেক বেশি শক্তির দরকার ছিলো। ১৯৬১ সালে নাসার 'মার্কারি বুস্টার', যেটি আমেরিকার প্রথম মনুষ্যবাহী নভোযান যা পৃথিবীর অক্ষে প্রদক্ষিণ করেছিলো। তিনটি ধাপবিশিষ্ট 'স্যাটার্ন ভি' প্রায় একটি নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারের সমান ছিলো। এই মহাকাশযানটি প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন পাউন্ড জ্বালানী নিয়ে এবং প্রায় ২৫০০০ মাইলস পার আওয়ার বেগে যাত্রা আরম্ভ করে। এই জ্বালানীর মধ্যে ছিলো প্রায় ১ মিলিয়ন গ্যালন কেরোসিন, লিকুইড অক্সিজেন ও লিকুইড হাইড্রোজেন। উৎক্ষেপন এবং তিনটির মধ্যে থেকে দুটি ইঞ্জিন ছেড়ে দেওয়ার পরে মহাকাশযানটি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ১২০ মাইল উপরে আবর্তন করতে থাকে। পৃথিবীকে একবার সম্পূর্ণ আবর্তনের পর 'অ্যাপোলো-১১' যাত্রা শুরু করে।
অ্যাপোলো-১১ হার্ডওয়্যারে তিনটি ভাগ ছিলো। প্রথমটি "লুনার মডিউল" (LM) ; যার কোডনেম ছিলো "ঈগল", দ্বিতীয়টি "কমান্ড মডিউল" (CM); যার কোডনেম ছিলো "কলম্বিয়া", এখানেই মহাকাশযাত্রায় ঘুরে বেড়াতেন এবং তৃতীয়টি "সার্ভিস মডিউল"।
দ্যা লাস্ট মুভ, যেটি আসলে 'Lunar orbit incertion' অর্থাৎ চাঁদের চারপাশে কক্ষপথে ঘোরার কাজটি কোন প্রকার বাধা ছাড়াই হয়ে গিয়েছিলো। মহাকাশযানটি চাঁদের উপরিভাগ থেকে ৬২ মাইল উপরে থেকে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। এরপরই চাঁদে নামার পালা। এই অংশটিকে লুনার মডিউলের "Power descent" নামে অ্যাখ্যা দেওয়া হয়, যেটি ছিলো তখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন কাজ। কমান্ড অ্যান্ড সার্ভিস মডিউল (CSM) থেকে ৩২০০০ পাউন্ড ভরবিশিষ্ট লুনার মডিউলকে আলাদা করার পর আর্মস্ট্রং এবং অলড্রিন প্রায় দুই ঘন্টা এটিকে চাঁদের সার্ফেসের দিকে চালনা করেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় এর পরই। শেষ মুহূর্তে ফুয়েল সাপ্লাই অনেক বেশি কমে আসলে অটো ল্যান্ডিং প্রোগ্রামে গোলযোগ দেখা দেয়। এমন সময় দক্ষ পাইলট আর্মস্ট্রং নার্ভ ধরে রেখে ম্যানুয়াল ল্যান্ডিং করতে শুরু করেন এবং ৩০ সেকেন্ডের রিজার্ভ ফুয়েল থাকা অবস্থায় ল্য়ান্ড করান। দলপতি আর্মস্ট্রং রিপোর্ট করেন, "The Eagle has landed."
Image source
চাঁদে অবতরন
দলপতি হিসেবে নীল আর্মস্ট্রংয়ের প্রথম চাঁদের বুকে পা রাখার সুযোগটা বেশি ছিলো। চাঁদে পা রেখেই তিনি তাঁর ঐতিহাসিক উক্তিটি করেন, "That's one small step for man, one giant leap for mankind."। পরবর্তী সময়ে তাঁরা ছবি রেকর্ড, চাঁদের পাথর, মাটির নমুনা এবং কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার যন্ত্রপাতি খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যেগুলোর কিছু অংশ তাঁরা চাঁদেই ফেলে আসেন। তারপর তাঁরা মডিউলে খাবার খান, কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে আবার কমান্ড ও সার্ভিস মডিউলের দিকে যাত্রা শুরু করেন। এরপর CSM এ পৌঁছে গেলে তাঁরা অনন্ত মহাকাশে লুনার মডিউলকে ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীর দিকে রওনা হন।
পৃথিবীর দিকে ফিরতে আরো একবার ইঞ্জিন সচল করলে এবার সার্ভিস মডিউলে সমস্যা দেখা যায় এবং তাঁরা কোণাকৃতির কমান্ড মডিউলে প্রবেশ করেন। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ঢোকার সময় দূর্ঘটনা এড়াতে হলে অতি সুক্ষ্ম ও নির্ভুল কোণ করে প্রবেশ করতে হবে। এসময় ঘটে নতুন বিপত্তি। এই অবস্থায় মডিউলের সাথে পৃথিবীর যোগাযোগ ব্ল্যাকআউট হয়ে যায়। উত্তেজনাকর তিন মিনিট পরে মডিউলের সাথে যোগাযোগ ফিরে পেলে পৃথিবীতে অ্যাপোলো-১১ সফল অবতরন করে। উৎক্ষেপনের ঠিক ৮ দিন, ৩ ঘন্টা, ১৮ মিনিট ও ৩৫ সেকেন্ড পরে মহাকাশযানটি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ হতে ৮০০ নটিক্যাল মাইল দূরে এবং নভোচারীদের রিকোভারী শীপের ১২ নটিক্যাল মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরে পতিত হয়। এরপরে নভোচারীদের ২১ দিন মেডিক্যাল অবজার্ভেশনে রাখার পর তাদের পরিবারের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
Image source
তিন নভোচারী
এভাবেই শেষ হয় পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম এক অধ্যায়, যার নাম হতে পারে,
"ফুটস্টেপ অন দ্যা লুনার সারফেস!"
Image source
ফুটস্টেপ অন দ্যা লুনার সারফেস