বাইক চলছে চট্টগ্রাম কোস্টাল রোড ধরে। ডানে তাকালেই দেখা যাচ্ছে অনন্ত সমুদ্র। পড়ন্ত বিকেলে কার্গোজাহাজ খচিত স্বর্ণালী সমুদ্রকে অনেকটাই অবাস্তব মনে হচ্ছিলো। উত্তরবঙ্গে জন্ম নেওয়া যে কারো কাছেই এমন দৃশ্য দেখে মনে হবে,“আচ্ছা,তবে এমনই হয় সাগর?”
কার্গোখচিত স্বর্নালী সমুদ্র
মাস্ক-চশমা এবং মাস্ক-হেলমেট আমার দেখা সবচাইতে বাজে দুটি কম্বিনেশন। কোস্টাল রোডে আমার মাস্ক আর হেলমেটের যুদ্ধ বন্ধ করতেই ঘাম ছুটে যাচ্ছিলো। কিন্তু যে যুদ্ধে আমার হাত কোন সন্ধি আনতে পারে নি, তা আনলো ‘পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত’। এটি কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ১৪ কিমি দক্ষিনে অবস্থিত। এর কাছাকাছি ‘শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ এবং বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ঘাঁটি ‘বিএনএস ঈসা খান’ অবস্থিত। পতেঙ্গা সৈকতের প্রস্থ খুব বেশি নয়। তবে এতে পর্যটকদের উৎসাহে কোনপ্রকার ভাটা পড়ে না। আমরা যে সময় পতেঙ্গা সৈকতে নামি, ততক্ষণে বেলা বেশ গড়িয়ে গেছে। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্বেও পানিতে নামা আর হয় নি। তাছাড়া এখানে সমুদ্রে সাঁতার কাটা খানিকটা বিপদজনকও। এখানকার আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো বিশাল পাথরখন্ড গুলো।
পাথরখন্ড
এগুলো রাখার কারণ হলো সমুদ্র সৈকতের ভাঙ্গন রোধ করা। সৈকতে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য অপেক্ষমান সারি সারি ছোট বড় জাহাজগুলো এর সৌন্দর্য্য আরো বৃদ্ধি করে। সৈকতে রাইডের জন্য ছিলো সী বাইক এবং ঘোড়া। এছাড়াও স্পীডবোটে দ্রুতগতিতে সাগরের জলে ভেসে বেড়ানোর ব্যবস্থাও আছে।
পতেঙ্গায় গিয়ে সমুদ্র দেখায় অন্যরকম অনুভুতি হয়েছিলো শুরুতে। সৈকতে নেমেই হঠাৎ আকাশে দেখি অনেক চিল উড়ছে, পরেই দেখি ওগুলো আসলে ঘুড়ি,অসংখ্য চিলসদৃশ ঘুড়ি। চট্টগ্রাম কোস্টাল রোড থেকে এই সৈকত মূলত অনেকটা নিচে, রোড থেকে সৈকতে নামতে গেলে তিন ধাপ নিচে নামতে হয়।
নিচে সৈকত,আকাশে উড়ছে ঘুড়ি
আর প্রতিটি ধাপেই আছে বিভিন্ন জিনিসপত্রের দোকান। খেলনাপত্র, তৈজসপত্র, কাঠের শোপিস আর ছিলো বার্মিজ আচার। আর সৈকতে নামলে পাওয়া যায় খোলা খাবার দোকানগুলো। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় খাবারটি ছিলো মশলাদার ভাজা কাঁকড়া, যা একটি ছোট প্লেটে কুচি কুচি শসা এবং পেঁয়াজ দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়।
খাওয়া দাওয়ার পালা শেষে শুরু হলো ফটোসেশন। সে যে কতভাবে, কত ভঙ্গিমায় ছবি তোলা ! বাসায় গিয়ে স্মৃতিচারণ করতে হবে যে। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে, পাথরখন্ডে দাঁড়িয়ে,বসে , সূর্যাস্তের আলোছায়া, সামুদ্রিক ডিঙ্গি,কার্গোজাহাজের ছবি তুলতে তুলতে কখন যে বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিলো টেরই পাই নি ! সবশেষে সৈকতের পিঁয়াজু, ফুচকা, পাপড় আর আইসক্রিম খেয়ে বাসার দিকে রওনা দেই। ফেলে গেলাম পতেঙ্গা, থেকে গেল মশলাদার কাঁকড়া ভাজা খাওয়ার সাধটা !
সবশেষে ফেরার পালা। আবার মাস্ক-হেলমেটের যুদ্ধ। কিন্তু এবার আর আগের মতো একঘেয়ে লাগছে না ! বাসায় এসেও যেন ঘোর কাটতে চায় না, যেন এখনও বঙ্গোপসাগরের বাতাসের ছোঁয়া এসে লাগছে। রাতে ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখি, সৈকতের নরম বালিতে পা খানিকটা আটকে গেছে; মৃদু ঢেউ এগিয়ে আসছে, তবুও সরে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। বরং সেভাবেই দাঁড়িয়ে আনেক দূরে মাঝসমুদ্রের কাছাকাছি চোখ পৌঁছে যায়। আরোও দূরে তাকানোর চেষ্টা করলে যেন বুঝে যাই, ওখানেই আকাশ এসে মিশেছে। সমুদ্র থেকে ফিরে এলেও সে ফেরেনি আমার হৃদয় থেকে, বরং গভীর ছাপ ফেলে গেছে মনের গহীনে।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত