গলায় ঘন্টাটা দুলিয়ে দুলিয়ে রহিম ব্যাপারীর কালো গাইটা কিছু একটা চিবুতে চিবুতে হেলেদুলে হাটছে। বাধানো পুকুরঘাটে বসে হঠাৎ খেয়াল হলো কারা যেনো আকাশ থেকে দু চামচ অন্ধকার ঢেলে দিয়ে ফরমালিনওয়ালা সন্ধ্যা নামিয়ে এনেছে। সন্ধ্যায় রঙ হয়েছে, মুয়াজ্জিন আজান দিলে সন্ধ্যাটা পেকে টসটসে লটকন এর মত হবে৷ তারপর ঝিঝিপোকারা দল বেধে ফেরীআলাদের মত সন্ধ্যা বিক্রিতে নামবে। আচ্ছা এই যে কালো গাই, ওর কি সন্ধ্যায় আমার মত বিষন্নতা ছোবল দেয়? একদিন জিজ্ঞেস করে নিতে হবে।
পুকুরপাড়ে এই হিজলতলায় বসে চা খাবার স্বভাব নাকি আমি দাদার কাছে পেয়েছি৷ আযান-নামায শেষে ইলিয়াসের মা আমাকে চা দিয়ে যাবে। একগ্লাস পানি, আর স্বর ভাষা এক কাপ চা। এখন আমি এখানেই সিগারেট ধরাই। আমার বাপ দাদা বেঁচে নেই, তবুও কেউ একজন অন্ধকারে সিগারেটের আলো দেখে আমার মুখে টর্চ মেরে দেখবে কে সিগারেট খায়। কাউকে বিচার দিতে পারবে না বলে হয়ত আফসোস করবে। এত বড় বাড়ি। এত বড় উঠান, সবজির বাগান, উঠানের ফজলি আমের গাছটা আস্তে আস্তে বটগাছের মত হয়ে যাচ্ছে। এই গাছের আম থেকে দারুণ একটা আমসত্ত্ব হয়। কিন্তু আমি আমসি এখন আর খাই না। আমার কারণে বানানো হয় না। কিন্তু আমি জানি ইলিয়াসের মা আমসি বানায়। আমি না জানার ভান করি। ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে। কুপি জ্বলছে। পাকঘর থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ঝিঝিপোকা আর ব্যাং এর ডাক অন্ধকারে মিলিয়ে চারপাশ মুখরিত হয়ে আসছে নীরবতায়। এখন মনে হয় রবিন দেখা করতে আসবে। রবিন একটু জলদি আসিস ভাই।
রবিন আমার একমাত্র ছোট ভাই। শেষ দেখা হয় আমার এই পুকুরপাড়েই। তখন পুকুরঘাট বাধানো ছিল না। আমরা দুপুর থেকে সেদিন মাছ ধরছিলাম, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে। একটা বড় তেলাপিয়া উঠে আমার বড়শিতে। আমি ঘড়ে গিয়ে বালতি নিয়ে আসব বলে ভিতরে যাই। ফিরে এসে দেখি আমসত্ত্ব শুকোতে দিয়ে মা আর নিয়ে যায় নি। আবার আমসত্ব ভিতরে রেখে এসে মনে পরে আমি বালতি রেখে এসেছি। আবার ভিতরে যাই। তখনই মা এসে ঝাড়ু দিয়ে ইচ্ছামত মারতে শুরু করে। কলপাড়ে গিয়ে গোসল করে ভিতরে এসে কাপড় বদলে মুড়িমাখা নিয়ে এসে মা জিগ্যেস করে রবিনের কথা। মাকে নিয়ে আবার পুকুরপাড়ে দিকে যাই। রবিন আমার মত কয়েকটা ঝাড়ুর বারি খাবে সেটা দেখতে। রবিন পুকুরে ডুবে ফুলে গিয়েছিল। আমার এখনো মনে আছে ও আমাকে যাবার সময় বলেছিল, "ভাইয়া তাড়াতাড়ি আসিস"৷