রেল স্টেশনের সামনের চায়ের দোকানের কোনে দেখতাম তাকে প্রতিদিন সকালে। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত রেলে ওটা মানুষের দিকে। অবাক করে তাকিয়ে কি যেন একটা দেখতো মানুষের মাঝে। তার দেখা দুবার পাওয়া যেতো দিনে। আমি যখন দোকানে সকলের নাস্তা খেতে যেতাম এবং যখন সন্ধ্যা বেলা চা খেতে যেতাম তখন।
আমি রেল স্টেশনের পাশে ছিলাম কিছুদিন। বাবা রিটায়ারমেন্টের পরে বেশ কিছুদিন আমাকে ওখানেই থাকতে হয় বাবার রিটায়ারমেন্টের টাকা তোলার জন্যে। বাবার রুমে থাকা হতো আমার এখানে আসার পর। বাবা আগে রেল স্টেশনে চাকরি করতেন স্টেশন মাস্টার পদে। বাবা তার চাকরির জন্য এখানেই থাকত সপ্তাহে পাঁচ দিন ও বাকি দুদিন ট্রেনে করে বাড়িতে চলে আসতেন। বয়স অনেকটাই বেড়ে যাবার কারনে ও অতিরিক্ত অসুস্থ হয়ে যাবার কারনে বাসার সবাই রিটায়ারমেন্টে যাওয়ার কথা বলে এতে বাবাও আর চাপ নিতে না পেরে চাকরির বয়স প্রায় দুই বছর বাকি থাকতেই রিটায়ারমেন্টে চলে যান। দুই বছর বাকি থাকতেই রিটায়ারমেন্টে চলে যাবার কারনে রিটায়ারমেন্টের টাকা নিয়ে একটু ঝামেলা হয়। যার ফলে আবার আসার দরকার পড়ে।
বাবার অসুস্থতার কথা মাথায় রেখে বাসা থেকে আমাকে পাঠানো হয়েছিল। এখানে এসে জানতে পারলাম একদিনে কাজ হবে না আমাকে আর সপ্তাহ খানিক অপেক্ষা করতে হবে। বাসা দূরে হওয়ার কারণে আমি আর বাড়ি না গিয়ে এখানেই বাবার আগের থাকার রুমে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। এর মধ্যে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যা বেলা দেখা পেতাম এক ভাবুক ছোকরার।
সে প্রতিদিন এসে দোকানের কোনে রাখা স্টিলের বেঞ্চটার পাশে দারিয়ে থাকত আর মানুষের ওঠা নামা করা দেখত মৃদু চোখে। আমার প্রথম দুদিন বিষয় টাকে অতটা পাত্তা দেইনি। তার পরের দিন আমার চোখে পড়ে বিষয় টা। আমি দেখলাম শুধু মাত্র ট্রেন আসার সময় ও যাবার সময় ও খালি মানুষের ওঠা নামাই দেখে। এমন করে প্রায় পাঁচ দিন পার হতে চল্লো। আমি পাঁচ তম দিনে খেয়াল করলাম সকালে ছেলেটা আজ আসেনি।
আমি কিছু না ভেবে সকালের খাবার খেয়ে চলে আসলাম আমার ঘরে। সেদিন বিকালেই আবার গিয়েছিলাম দোকানে বিকাল বলতে এই আরকি সন্ধার আগের দিকে। চা খেলাম সব ঠিকই চলতেছিলো, বাবার রিটায়ারমেন্টের টাকা টাও পরের দিন পেয়ে যাব বলে জানিয়েছিলেন ওখানকার ম্যানেজার সাহেব।এগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সন্ধ্যা নেমে গেল। তবে ছেলেটির দেখা পেলাম না সন্ধ্যা বেলাতেও। ছেলেটার জন্যে বসে ছিলাম এত সময় কিন্তু সে তখনও এলো না। ট্রেন এসে চলেও গেল তবে তার দেখা নেই। খুব কৌতুহল বসত দোকানদার কে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম দাদা তোমার দোকানের পাশে যে ছোকরাটা দারিয়ে থাকে সে কেগো? আজ যে দেখলাম না তাকে সারাদিন।
দোকানে থাকা প্রায় ৪০-৪৫ বছর বয়সী লোকটা বলে উঠলেন ঐ হাফ পেন্ট পড়া ছোকরাটার কথা কইতাছেন ? আমি বললাম জি ওর কথাই বলছি। তখন সে বলতে লাগলো অর নাম বেলায়েত। অর মা মারা যাওনের পর অর বাপে আরেক্ষান বিয়া বইছে, তারপর অরে অর বাপে রেলঘাটে রাইখা চইলা গেছে হের নতুন বউয়ের লগে। এর পরেরতে অয় এনেই আছে। প্রথম দিক দিয়া অনেক কান্নাকাটি করত তয় অহন ভালাই আছে। বাপ মা নাই তো সবাই টুকটাক হগলেই আদর করে,পোলাডার চোখে বড্ডো মায়া।
কথাটা শুনে খুব খারাপ লাগলো আমার। একবার ভাবলাম একটু খুজি ওকে পরে আবার ভাবলাম কোথায় খুজবো আর আমি তো এখানকার কিছুই চিনিনা ভালো করে। পরে তার দেখা ছাড়াই ঘরে চলে গেলাম ও পরেরদিন কাগজপাটি ঠিক করে বাড়ির পথে রউনা দিলাম। যাবার পথে ট্রেনে বসে বসে একটা কথাই ভাবছিলাম আসলে সবার বাবা তার সন্তানের জন্য যুদ্ধ করে না। যাদের বাবা করে তারা আসলেই ভাগ্যবান।