যদি একটা সার্ভে করেন ১০ জন মানুষের মধ্যে। যেখানে তাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করবেন সে কি করতে চায় তার জীবনে তার একটা লিস্ট দিতে। ১০ জনের মধ্যে ৭-৮ জনের লিস্টেই পাবেন ভ্রমন করা। এখন কথা হল সবাই চায় ঘুরতে, কিন্তু সবাই পারেনা।
টাকা পয়সা, সময়,ছুটি এসব বড় একটা ফ্যাক্টর। এসব ম্যানেজ করেও অনেকের ভ্রমন হয়না সঙ্গীর অভাবে। আমি আমার ছোটবেলার বন্ধুদের অনেকবার বলেছি চল সবাই মিলে কক্সবাজার ঘুরে আসি, অনেক মজা হবে। বেশিরভাগের বাজেট শুনে উত্তর ছিল, এত টাকা হলে আমি ফোন কিনবো ঘুরতে যাব না। আমি একা যেতে সাহস করতে পারিনাই, তাই সব থাকা সত্বেও আটকে গেলাম। পরে অবশ্য গিয়েছি অন্যদের সাথে। ফেসবুকে পরিচয় হওয়া এক বড়ভাইয়ের ভরসায় চলে গিয়েছিলাম বান্দরবানে, একদম নেটওয়ার্কের বাইরে পুরা সপ্তাহ। সে ট্যুরে বুঝেছিলাম চেনা বন্ধুদের সাথে ঘোরা আর অপরিচিত মানুষের সাথে ঘোরার মাঝে অনেক তফাত। আমি ঠিকই ঘুরেছি, এবং আমি জানি আমার বন্ধুরা একদিন আফসোস করবে।
সঙ্গীর অভাবে ঘোরা হয়ে উঠে না এটা হল যারা ঘুরতে চায় তাদের ৮০% মানুষের অভিযোগ। যদি আপনি সবকিছু নিয়ে সঙ্গীর অভাবে ঘুরতে না পারেন। তবে মনে রাখবেন কোনদিন ই ঘর থেকে বেরুতে পারবেন না। আপনার যখন ছুটি সঙ্গীর ছুটি হবেনা আর যখন সবার ছুটি পকেটে টাকা থাকবেনা। দিনশেষে বাধা অনেক আসবে। কথা হল যদি সত্যি চান ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন একা। আমি ৩-৪ বছর অপেক্ষা করেছি সঙ্গীর জন্য, পাইনি। ভ্রমন সঙ্গী আমরা খুঁজি ভরসার জন্য, যে কোন সমস্যা হলে সমাধান সহজে হবে এমন আশায়। আসলে ব্যাপার টা তা নয়। ভ্রমনে আপনার সবচেয়ে বড় বন্ধু হল তথ্য, কমনসেন্স আর টাকা। এ তিনটা জিনিষ ছাড়া আর কিছু লাগেনা, এতিনটা জিনিষ যদি না থাকে তবে যতই সঙ্গী থাকুক বিপদে পড়বেন। বিপদ থেকে বাঁচার সবচে বড় পদ্ধতি হল গাট ফিলিং বা ইনট্যুশন। এটা সবার ই কাজ করে, আপনি যদি একটা জায়গা সেফ ফিল না করেন তবে সত্যি সেটা সেফ নয়। মনের কথা সবসময় শুনবেন এমন ক্ষেত্রে।
আমি অনেকবছর অপেক্ষার পর যখন পেলাম না সঙ্গী, তখন খুঁজতে শুরু করলাম একা ঘুরতে গেলে চ্যালেঞ্জ গুলো কি কি। অনেক সলো ট্র্যাভেলারদের ব্লগ, ভিডিও, দেশি অনেক বড়ভাই আপুদের গল্প শুনলাম। আসলে সলো ট্র্যাভেল করা খুব কঠিন কিছু না। আর কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
আমি লিস্ট করা শুরু করলাম আসলে আমার লিমিটেশন টা বা ভয় টা কোথায় এবং কেন। আমি রাজশাহী শহরে থাকি, মাঝে মাঝেই ঢাকা শহরে যাওয়া পড়ে। রাজশাহী থেকে ঢাকা বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে নতুন শহর। সেখানে তো একা একাই ঘুরি কিন্তু সেখানে তো কোনদিন সমস্যা মনে হয়নি। এর কারণ গুলো কি কি?
১. ঢাকা তে আমার পূর্বপরিচিত অনেক বড় ভাই/আপু /বন্ধু আছে।
২. পয়েন্ট এ টু পয়েন্ট বি কিভাবে যেতে হয়,কত টাকা ভাড়া তা তাদের থেকে জেনে নিয়েছি।
৩. বাসে উঠে পকেট সাবধান, মানিব্যাগ সামনের পকেটে, রাস্তাতে হাঁটার সময় ফোন টেপাটিপি না, সিএনজিতে জ্যামে বসে ফোন টিপতে না, বাসে জানালার পাশে বসে ফোনে কথা বলা না, উমুক রাস্তা গভির রাতে না, উমুক হোটেল রেস্টুরেন্টের খাবার ভাল। এসব সেফটি টিপস যেনে নিয়েছি।
আমি ঢাকাতে রাস্তায় বেরুলে প্যানিকড হইনা কারণ আমি জানি ঢাকা কেমন, কি কি সমস্যা হতে পারে, কি কি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এখন এসব জেনেছি আমার বন্ধু, বড় ভাই বা বোন থেকে বা ফেসবুকে কোন গ্রুপে বা পেজে বা নিউজে সতর্কতামুলক পোষ্ট পড়ে। এসবের মধ্যে কমন সেন্স হল আরেকটা ফ্যাক্টর। এখন দেশে হরতাল চলে, মারামারি চলতেসে ঢাবি ক্যাম্পাসে। কমনসেন্স থাকলে কেউ এমনদিনে ঢাবি ঘুরতে যাবে না। এখানে বন্ধুর সাজেশনের চেয়ে টিভি বা পেপারে নিউজ দেখলেই অনুমেয়। ভুল জায়গাতে ভুল সময়ে না, তাই চোখকান সব সময় খোলা রাখতে হবে।
তাই ইন্টারনেটে ঘেটে ঘেটে যে শহর বা দেশে যাব সেটা সম্পর্কে সব তথ্য বের করা শুরু করলাম। জানতে শুরু করলাম শহর সম্পর্কে। ম্যাপ দেখে দেখে আইডিয়া নিলাম কতটা দুরে দুরে সব জায়গা। আমি যেখানে থাকবো, যেগুলো ঘুরবো সেগুলো কোথায়। জায়গাগুলো এন্ট্রি ফি কত, কতটা সময় খোলা থাকে। কি কি সাথে নিতে হবে, কতটা সময় লাগবে। শহরের নিজস্ব রুলস, পুলিশ স্টেশন, হাসপাতাল কোথায় এসব টুকিটাকি সব ইনফো জেনে নেয়া শুরু করলাম।
ব্যাস ১০-১৫ দিন পড়ার পর মোটামুটি শহরের বেসিক সব তথ্য আমি জানি। দুদিন আগে যে দেশটার নাম জানতাম না আজ তার একটা শহরের চিপাগলির বেস্ট পানের দোকানের খবর ও আমার জানা। এসব তথ্য ইন্টারনেটে তারাই দিয়ে রাখছে যারা একসময় আমার মত কিছু জানতো না। আর এ প্রশ্নগুলো ৮০% মানুষের মাথায় ই ঘুরপাক খায়। তাই সবার সমস্যা যেহেতু, সিমিলার তাই নেটে এসব সম্পর্কিত তথ্যের অভাব নেই।
যখন আমি টুকিটাকি সব তথ্য জানি, কোথায় কি করতে হবে বা করতে হবেনা জানি তখন সব ভয় উবে গেল। শহরটা আমার কল্পনাতে ঘুরতে শুরু করলো। যখন সাহস করে চলে গেলাম এসব তথ্য কে পুঁজি করে। এয়ারপোর্টে নেমেই মনে হল, এ তো আমার চেনা শহর। সামনে দু ব্লক পরেই চায়ের দোকান, ট্যাক্সি স্টপ।
আমার পার্সোনাল পরামর্শ হল একটা জায়গা সম্পর্কে বেসিক তথ্য জানা পর্যন্তই ওকে। বাকিটা গিয়ে এক্সপ্লোর করবেন। যেমন তাজমহল কোথায়, কোন বাস ধরে যেতে হয়, টিকেট ফি কত, ঘুরে দেখতে কতটা সময় লাগে এতটা ইনফো জানা যথেষ্ট। বাকিটা গিয়ে এক্সপ্লোর করবেন। বেশি অবসেসড হয়ে, তাজমহলের উমুক চিপায় রাতে শাহজাহান বসে থাকে, উমুক চিপায় গোপন দরজা দিয়ে বাথরুম। বা উমুক ঘরে কেউ গেলে ভুতে ধরে এসব গল্প জানার কোন দরকার নাই। অধিক তথ্য আপনাকে বিভ্রান্ত করবে, তাই জাষ্ট বেসিক যেনে যাবেন।
আমি যেমন মালেশিয়াতে অনেক গুহা সম্বলিত টেস্পল একা একা ঘুরেছি, রাতে অনেক নির্জন জায়গাতে একা একা হেঁটেছি। সত্যি বলতে সে নির্জনতা আমি উপভোগ করেছি। পরে হোটেলের বিছানায় শুয়ে শুনলাম সেসব জায়গার ভৌতিক গল্প, বিছানা থেকে উঠে বাথরুম যেতেই তখন ভয় লাগার অবস্থা। আমাকে কোন ভুতেও ধরে নি আর মরি ও নাই। তাই অধিক তথ্য যেনে মজা টা নষ্ট করবেন না।
আর একা ভ্রমনের যে মজা আছে তা যখন নিজের প্রথম সলো ট্রিপ দিবেন তখনি বুঝে যাবেন। নিজেকে প্রথম বারের মত স্বাধীন মনে হবে। এই স্বাধীনতার স্বাদ একবার পেলে আপনি আর কখনোই কারো সাথে সহজে ঘুরতে যেতে চাইবেন না।
ও হ্যা এই ভ্রমণে যাবার ভয়কে বলে হোডোফোবিয়া। আপনার হোডোফোবিয়া আছে কিনা আর কিভাবে এটা থেকে মুক্তি পাবেন নিচের লিংকে বিস্তারিত পাবেন।
https://www.healthcentral.com/article/hodophobia-the-fear-of-traveling
Please Upvote & Comment.