Facebook page HK Love story থেকে কপি করা পোষ্ট..
।।।।চার বছর আগের কথা। ২০১৪ সাল, আমার এস এস সি পরীক্ষা চলছে। আমি হোস্টেলে থাকতাম। আমাদের পরীক্ষা আমাদের প্রতিষ্ঠানেই হতো। সেবার আমাদের কেন্দ্রে ছারপোকার মতো ম্যাজিস্ট্রেটের খুব উৎপাত চলছিলো। প্রতিদিন ম্যাজিস্ট্রেট আসতো। একেকবার একেক হলে গিয়ে সে ১৫/২০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতো। এমনিতেই আমি এতটা ভালো ছাত্র না। তার উপর ম্যাজিস্ট্রেট এর এরকম জ্বালা। আমাদের যে হলে এক্সাম হচ্ছিলো সেটি দোতলায় থাকায়, ম্যাজিস্ট্রেট আসার আগে একটু বাতাস পেতাম। এবং সবাই নড়েচড়ে বসতাম।
.
সেদিন খুব সম্ভবত গণিত পরীক্ষা চলছিলো। আমার পিছনের জন ছিলো খুব ভালো ছাত্র। আমি কলমের গোড়া কামড়াতে কামড়াতে পিছনে তাকিয়ে দেখে দেখে লিখছিলাম। মাথা ঠিক অবস্থায় রেখে চোখটা একটু বাঁকা করে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখি ম্যাজিস্ট্রেট আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। ভয় পেয়ে সোজা হয়ে বসে দেখি আমার খাতা নেই। হয়ত, গার্ডের দায়িত্বে যিনি ছিলেন তিনি ব্যাপারটি লক্ষ করেছিলেন তাই আমার খাতা টা নিয়ে গেছেন। ভয়টা কমে গেছে, কারণ ম্যাজিস্ট্রেট খাতাটা নিলে কি করতো, কতক্ষন আটকে রাখতো আমি জানি না। শিক্ষক নিয়েছেন মানে কিছুক্ষণ পর দিয়ে দিবে। তবে, খেলা হয়েছিলো রসায়ন পরীক্ষার দিন।
.
রসায়ন পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে গিয়ে দেখি আমাদের হল পরিবর্তন হয়েছে। নিচে একটা বড় হল আছে ঐটাতে বিজ্ঞান বিভাগের সবগুলো পরীক্ষা সবার এক সাথে হবে। গেলাম সে হলে, গিয়ে দেখি আমার সিট টা একদম সবার সামনে। ওইদিন পুরো তিন ঘন্টা ম্যাজিস্ট্রেট আমার সামনে দাঁড়ানো ছিলো। মাথা উঁচু করতেও ভয় পাচ্ছি, ডানে বামে তাকানো তো দূরের কথা। আমার মনে হচ্ছিলো যে, কেউ আমার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বলছে "লেখ শালার ব্যাটা, মাথা নড়ালে গুলি করে দিব খোদার কসম"। সেদিনের ঝামেলা না হয় শেষ হলো।
.
একদিন পর পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষা, এই হলেই যদি পরীক্ষা চলে তবে আমার এস এস সি রেজাল্ট এ ফিজিক্স এর পাশে বড়সড় "এফ" দেখা যেতে পারে। টেনশন এ মাথার চুল কমে যাচ্ছে। আর বারবার পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠছে। বাথরুমে বসে আছি। হঠাৎ মাথায় চিন্তা আসলো যে, কোনোভাবে যদি ঐ হলের তালা গুলো নষ্ট করে দেয়া যায়, তাহলে সকালে যখন তালা খুলতে গেলে তালা খুলবে না তখন তালা ভাঙায় সময় নষ্ট না করে আমাদের পরীক্ষা হয়তো দোতলয়ই হবে। দুনিয়ার সব চেয়ে ভালো ভালো বুদ্ধি মনে হয় বাথরুমে বসলেই আসে। যেই ভাবা সেই কাজ। হাসানকে কল দিলাম,
-হাসান কই তুই?
-বাসায়।
-প্রিপারেশন কেমন?
-এক্সাম দিবো না।
-মানে?
-ঢং করছ? মানে কি বুঝস না? এভাবে ম্যাজিস্ট্রেট সামনে দাঁড়ায় থাকলে এক্সাম দেয়া যায়? আর আমার ফিজিক্স এর অবস্থা তুই জানস না?
-একটা ভালো বুদ্ধি পাইছি দোস্ত।
-কি বুদ্ধি?
-কোনোভাবে হলের তালাগুলো নষ্ট করে দিতে পারলে এক্সাম গুলো আগের হলেই হতো।
-তা ঠিক, কিন্তু ক্যামনে?
-আচ্ছা, তুই দেখা কর। দুজন মিলে কিছু একটা বের করে ফেলবো।
-ওকে।
.
দুজন মিলে সেদিন হাফ প্যাকেট সিগারেট পোড়াতে পোড়াতে হটাৎ আমার মাথায় বুদ্ধি আসলো, তালা গুলোর চাবি ঢুকানোর জায়গায় যদি সুপারগ্লু মেরে দেয়া যায় তবে কাজ হতে পারে। আর যেহেতু চাইনিজ তালা, ভাঙতেও অনেক দেরি হবে। পরীক্ষার দিন এত সময় নষ্ট করবে না আগের হলেই পরীক্ষা হবে। বুদ্ধি আসতে দেরি, কাজ করতে দেরি নেই। তবে কাজটা করার পরে খুব ভয় পেয়েছিলাম। যদি কোনো ভাবে জানা যায় যে, এই কাজ আমি করেছি তবে আমার লাইফ শেষ। আরেকটা ভয় করছে যে, আদৌ সুপারগ্লু কাজ করবে কিনা।
.
পরীক্ষার দিন সকালে কেন্দ্রে গিয়ে আশেপাশের বাতাসে অনেকের কথা ভেসে আসছিলো যে, হলের তালা নাকি খোলে না। আমার বুক ধড়ফড় করছে ভয়ে। ধরা পড়ে গেলে আমি শেষ। সবার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, সবাই আলাদিনের চেরাগ পেয়ে গেছে। এক বন্ধু এসে আমাকে বললো, "কিরে দোস্ত তালা তো খুলে না, ভালোই হলো কি বলিস?" আমি খুব কষ্ট করে হেসে বলছিলাম "হ্যা দোস্ত" এমন ভাবে হেসেছিলাম যেন, আমার পেটে গন্ডগোল।
কেরানী গেলো প্রিন্সিপাল এর রুমে,
-স্যার, তালা তো খুলে না।
-কও কি!
-হ স্যার।
-ক্যান? খুলে না ক্যান?
-তালার ভিতরে কেউ সুপারগ্লু মারছে মনে হয়।
প্রিন্সিপাল মুচকি মুচকি হাসছে।
-সত্যি!
-হ স্যার।
-আচ্ছা, দোতলার ক্লাস গুলা খুলে দাও।
.
দোতলায় পরীক্ষা দিচ্ছি, আর মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছি। এদিকে প্রিন্সিপাল হলে এসে একবার বলে গেলো, "হোস্টেলে যারা থাকিস, তারা এক্সাম শেষে আমার রুমে এসে দেখা করে যাবি" । বুঝলাম যে, উনি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছেন। সে যাইহোক, সবার পরীক্ষা তো ভালো হয়েছে। এক্সাম শেষে প্রিন্সিপাল এর রুমে আমরা ক'জন দাঁড়িয়ে। স্যার বললেন,
-দ্যাখ, যা করছস মাফ করলাম। কিন্তু, তালা গুলার দাম টা দিস।
একজন বলে উঠলো,
-স্যার আমরা কেউ করি নাই বিশ্বাস করেন।
-তোরা ছাড়া এই কাজ অন্য কেউ করতে পারে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তাই আমাকে কষ্ট না দিয়ে তালার দাম গুলা দিয়ে দিস।
-জ্বী স্যার।
.
যেহেতু এই কাজের জন্যে সবার পরীক্ষাই ভালো হয়েছিলো। সবাই মিলেই ছয়টা তালার দাম জরিমানা দিয়েছিলাম। পরে অনেক বন্ধুরাই জানতে পারে আমিই কাজটা করছিলাম।
মুশিউর তো এখনও আমার সাথে দেখা হলে দাঁত কেলিয়ে বলে, "দোস্ত, সুপারগ্লু'র বুদ্ধিটা ক্যামনে পাইলি?"