তখন কলেজে পড়তাম। আঠারো বছর বয়স। সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই বিখ্যাত 'আঠারো বছর বয়স' কবিতার আঠারো বছরের ছেলেদের মতই ভয়হীন, ভয়ঙ্কর, দুর্বার ছিলাম। নিজেদের অবাধ স্বাধীনতার সময়ে কখনো অন্য কারো পরাধীনতার কথা মাথায় আসেনি। এমনই এক সময় ক্লাস পার্টিতে মনোবিজ্ঞানের মিস (ম্যাডাম/শিক্ষিকা) একটা গাইলেন। গানের শুরুতে তিনি বলেছিলেন- 'এটা নারীদের জাতীয় সঙ্গীত।'
মিস গানটা গাওয়ার আগেও ভাবতে পারিনি কোন গান এতটা ছুঁয়ে যাবে, এতটা ভাবাবে, এতটা বদলে দিবে চিন্তা-ধারণা। তিনি শুরু করলেন-
আমি শুনেছি সেদিন তুমি”
আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউ–এ চেপে
নীলজল দীগন্ত ছুঁয়ে এসেছ,
আমি শুনেছি সেদিন তুমি নোনাবালি তীর ধরে
বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছ
এটা এমন আর কি কথা? সাগর তটে আমরা প্রায়ই যাই। ঘুরি, হাঁটি, দৌড়াই। এটা গানের মাধ্যমে বলেছে। এটা নতুন কিছু না। কিন্তু তখনও পরে পঙতির জন্য তৈরি ছিলাম না। যখন তিনি গাইলেন,
আমি কখনও যাইনি জলে,
কখনও ভাসিনি নীলে,
কখনও রাখিনি চোখ,
ডানামেলা গাঙচিলে
ভেতরটা যেন মুচড়ে উঠলো। কতটা গভীর ক্ষোভ থাকলে কথাগুলো এভাবে উঠে আসতে পারে! কত অভিযোগ, কত প্রশ্ন আছে এই লাইগুলোতে? কেন এমন হয়? কেন আমরা আঠারো বছর বয়সের ছেলেরা চাইলেই যেখানে ইচ্ছা যেতে পারি, কিন্তু সমবয়সী মেয়েটা যেতে পারে না? কেন আমার মত সেও নীল জলে ডুবাতে পারে না? কেন মুক্ত আকাশে স্বাধীন ভাবে উড়ে চলা গাঙচিলটার মত সেও উড়তে পারে, দেখতে পারে না গাঙচিলটাকে? তারপর তিনি আবার গাইলেন,
আবার যেদিন তুমি সমুদ্রস্নানে যাবে
আমাকেও সাথে নিও,
নেবে তো আমায় ?
বল, নেবে তো আমায় !
এখানে যেন নারীদের অসহায়ত্ব আরো করুণ করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমরা তাদের স্বনির্ভরশীল হতে দেই না। তারা চাইলেও তারা পারে না, পারতে দেয়া হয় না। বাধ্য হয়ে তারা আমাদের আনুরোধ করে। আমাদের কাছ থেকে করুণা প্রার্থনা করে। এবং তারা আমাদের দয়ার উপর নির্ভরশীল। কতটা গভীর থেকে এসেছে এই কথাগুলো?
মৌসুমি ভৌমিকের গাওয়া গানটার পরের লাইনগুলো ধীরে ধীরে আরো বেদনাময় পথে অগ্রসর হয়েছে। যেমন -
আমি শুনেছি সেদিন নাকি তুমি তুমি তুমি মিলে
তোমরা সদলবলে সভা করেছিলে,
আর সেদিন তোমরা নাকি অনেক জটিল ধাঁধাঁ
না–বলা অনেক কথা, কথা তুলেছিলে :
আমাদের সমাজ পরিচালনায় নারীদের দূরে রাখা এবং শিক্ষায় নারীদের অগ্রপথে বাধা দেয়াটাই যেন ফুটে উঠেছে এ লাইনগুলোতে। সকল বিষয়ে কেবল পুরুষই থাকবে, সেখানে নারীদের প্রবেশাধিকার নাই; এই অভিযোগটাই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কেন শুধু ছুটে ছুটে চলা
একই একই কথা বলা
নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে ?
যদি ভালবাসা না–ই থাকে
শুধু একা একা লাগে
কোথায় শান্তি পাব, কোথায় গিয়ে ?
বল, কোথায় গিয়ে ?
একথাগুলো নিজেকেই নিজে বলা। একই পরিসরে সমগ্র জীবন পার করা, নিজের সাথে নিজের একই কথা বার বার বলা, সবকিছু করার পরও পুরুষদের অবজ্ঞার শিকার নারীরা তাদের প্রাপ্য ভালোবাসা পায় না। এটি তো উপমহাদেশের সমগ্র নারীর একটি জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আমি শুনেছি তোমরা নাকি এখনও স্বপ্ন দেখো,
এখনও গল্প লেখো, গান গাও প্রাণ ভরে,
মানুষের বাঁচা মরা এখনও ভাবিয়ে তোলে,
তোমাদের ভালবাসা এখনো গোলাপে ফোটে|
এ কথাগুলো আশার সঞ্চার করে। এতো এতো পুরুষের পুরুষত্ব প্রমাণের চেষ্টার ভীড়েও কিছু 'মানষ' আছে। যারা স্বপ্ন দেখে সুন্দর, শান্তির একটি পৃথিবীর। যারা এখনো ভালোবাসতে জানে, ভালোবাসে। পরিশেষে,
আস্থা–হারানো এই মন নিয়ে আমি আজ
তোমাদের কাছে এসে দুহাত পেতেছি,
আমি দু’চোখের গহ্বরে শূণ্যতা দেখি শুধু
রাতঘুমে আমি কোনো স্বপ্ন দেখিনা,
তাই স্বপ্ন দেখবো বলে
আমি দু’চোখ পেতেছি
তাই তোমাদের কাছে এসে
আমি দু’হাত পেতেছি
তাই স্বপ্ন দেখবো বলে
আমি দু’চোখ পেতেছি
সবার উপরে আস্থা হারিয়ে সেই সব স্বপ্নালু এবং প্রকৃত মানুষদের কাছে সাহায্য চাচ্ছেন যাতে করে পৃথিবীটা হয়ে উঠে সবার জন্য সমান। যাতে কেউ মুক্ত হয়ে রুদ্ধ না হয়, অধিকার থাকা স্বত্বেও তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না হয়।
নারী নির্যাতন, যৌণ হয়রানি, নারীদের অধিকার, নারীদের অবজ্ঞা করাঃ এসকল বিষয়ের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে যে গানটি গেয়েছিলো মৌসুমী ভৌমিক তা মেয়েদের জাতীয় সঙ্গীত না হলেও এটা যে অসাধারণ একটি প্রতীকী গান তাতে কোন সন্দেহ নাই।
[Note: A famous Bengali Music Lyrics have been used in the blog.
Song Details
Album : Ekhono Golpo Lekho
Song Name : Swapno Dekhbo Bolay
Singers : Mousumi Bhowmik
Lyrics : Mousumi Bhowmik
Compose : Moushumi Bhowmik Siddartha Chatterjee Rimi B. Chatterjee Dhruba Basu Roy Madhu Mukherjee Biswajit Roy
Label : Times Music
Year :2000]