গান মানুষের চিত্তবিনোদনের অন্যতম একটা অংশ। এখনকার দিনে গান হয়ে উঠেছে মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী। দিন শেষে ক্লান্তি দূর করতে আমরা যখন বিশ্রাম করি তখন তা আরো গতিশীল করতে আমরা গান শুনি। ভ্রমনের আনন্দ দ্বিগুন করতে আমরা গান শুনি। মন খারাপ থাকলে গান শুনি, গান শুনি মন ভালো থাকলেও। অর্থাৎ গান হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনের অপরিহার্য একটি অংশ।
কিন্তু এখনকার বাংলা গান আমাদের আর খুব একটা টানে না। এখনকার গানগুলো কেমন অদ্ভুত যেন। নেই সুরের মূর্ছনা, নেই শব্দের গভীরতা। মৌলিকতা নেই, মিউজিকের আসল স্বাদও পাওয়া যায় না এখনকার গানগুলোতে। কালেভদ্রে যে দু-একটা গান আসে তাও যৎসামান্য! নচেৎ এখনকার প্রকাশিত হওয়া বেশির ভাগ গানই মনে প্রশান্তি দেয়াতো দুরের কথা, মনে বিষণ্ণতা এনে দেয়। গানের তালে তালে, ছন্দে ছন্দে নিজের কথা ভাবার চেয়ে গানের এমন অপমৃত্যু কিভাবে হচ্ছে সেটাই ভাবায় বেশি।
অথচ বাংলা গানের অতীত ছিলো প্রাচুর্যে ভরপুর। এপার বাংলা এবং ওপার বাংলার শিল্পিরা তাল মিলিয়ে জন্ম দিত একের পর এক জগতজয়ী, কালজয়ী গান। ব্যান্ড সংগীত হোক আর একক সংগীত হোকঃ প্রতিটি গানই ছুঁয়ে যেত শ্রোতাদের মন। এখনকার মত তখন আধুনিক মিউজিক ডিভাইস না থাকলেও গানে প্রাণ ছিলো আর তা মাতাতো প্রতিটি হৃদয়কে। উদ্ভাসিত করত প্রতিটি হৃদস্পন্দনকে।
৭০ এর দশকের 'মহীনের ঘোড়াগুলি'র কালজয়ী গান 'পৃথিবীটা নাকি' এখনো আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করতে সক্ষম। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত এ গানের সুরের অনুকরণে ২০০৬ সালে বলিউডের একটি সিনেমায় (Gangstar) 'ভিগি ভিগি' গানটি গাওয়া হয়।
Source মহীনের ঘোড়াগুলির কালজয়ী গান 'পৃথিবীটা নাকি'র কথা
আজম খান; বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের জনক বলা হয় তাকে। দেশের জন্য যুদ্ধ করা আজম খান দেশকে উপহার দিয়েছিলো কালজয়ী কিছু গান। ৭০'র দশকে গাওয়া তার 'বাংলাদেশ' (রেললাইনের ওই বস্তিতে) এখনো আমাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেয় বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা। আজম খান পরবর্তীতে আমাদের 'জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে' এলবাম উপহার দেন যা বাংলাদেশের প্রথম হার্ডরক এলবাম।
মাইলসঃ বাংলা গানে রক মিউজিকের অন্যরকম এক ধারা তৈরি করে মাইলস ব্যন্ড। তাদের কালজয়ী 'ফিরিয়ে দাও' এখনো বাংলাদেশের সেরা পার্টি সং'গুলোর একটি। তারা আমাদের উপহার দিয়েছে 'নীলা' 'পাহাড়ি মেয়ে' 'অনামিকা' 'পিয়াসী মন' 'পলাশীর প্রান্তর' 'চাঁদ-তারা-সূর্য' 'প্রিয়তমা' 'জাতীয় সংগীতের দ্বিতীয় লাইন'র মত অতীবসুন্দর মনোমুগ্ধকর গান।
এল.আর.বি এবং নগর বাউলঃ এদের বলা হয় বাংলার ঘরে ঘরে গান পৌছে দেয়া পোস্টম্যান। আইয়ুব বাচ্চু এবং জেমস'কে চিনে না, তাদের গান শুনেনি এমন বাঙ্গালী খুজে পাওয়া মুশকিল। বাংলা মিউজিক ইন্ডার্স্ট্রিকে সমৃদ্ধ করতে অসংখ্য গান উপহার দিয়েছে এই দুইজন। এখনো রাতের আঁধারে মানুষ 'সেই তুমি' 'এই তারা ভরা রাতে' 'এখন অনেক রাত' শুনে নিজেকে শান্তনা দেয়। মানুষ জেমসের 'বাবা কতদিন কতদিন দেখিনি তোমায়' কিংবা 'দশ মাস দশ করে গর্ভ ধারণ' অথবা 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' শুনে নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে একটা মোচড় অনুভব করে।
ব্যক্তিগত ভাবেও অনেকে আমাদের অনেক গান উপহার দিয়েছে। আবিদের 'বন্ধু তোমায় এ গান শুনাবো বিকেল বেলায়', মৌসুমী ভৌমিকের 'আমি শুনেছি সেদিন তুমি', সুকান্তের 'আমার সারাটা দিন', সুবীর নন্দীর 'এক যে ছিলো সোনার কন্য', সঞ্জীব চৌধুরীর 'আমি তোমাকেই বলে দিবো', আমার একলা আকাশ থমকে গেছে'র মত অজস্র অজস্র কালজয়ী গান আমরা পেয়েছি তাদের কাছ থেকে। মাঝখানে ডিফারেন্ট টাচ, চন্দ্রবিন্দু আমাদের মাতিয়ে গেছে। 'চিরকুট' 'ব্লাক - বাংলাদেশী ব্যান্ড' 'আর্টসেল' 'শিরোনামহীন' 'ওয়ারফেইজ' 'আর্ক' 'নেমেসিস' 'ক্রিপ্টিক ফেইট'সহ অনেক রক, মেটাল এবং হার্ডরক ব্যন্ড আমাদের দারুণ সব গান উপহার দিয়েছে।
()
Source রুদ্র মুহাম্মদ শহীদউল্লাহ
ডিফারেন্ট টাচের 'শ্রাবণের মেঘগুলি জড়ো হলো আকাশে' বন্ধুদের আড্ডার একটি অকাট্য অংশ। 'চন্দ্রবিন্দু'র 'কোথায় আছো কেমন আছো' তেমনই একটি গান প্রেমিকদের।
ব্যক্তিগত ভাবে বাপ্পা মজুমদার আমাদের উপহার দিয়েছে 'রাতের ট্রেন' 'পরী' 'চন্দ্রবিন্দু' 'দিনবাড়ি যায়' 'এক মুহূর্ত'র মত অসংখ্য গান। ব্লাক ছেড়ে আসার পর তাহসান 'আলো' 'আমি সেই সুতো হবো' 'ইর্ষা' 'ইচ্ছা'র মত গান দিয়েছে। মিনার রহমান এবং অর্নব দিয়েছে ভিন্ন স্বাদের আবহ সংগীত। কোনাল, কনা, এলিটা করিমরা দিয়েছে বিশুদ্ধ কিছু গান। আগুন, খালিদ, আসিফ আকবর, মনির খানরা রাজ করে গেছেন কয়েক যুগ।
গান উপহার দিয়েছে ওপার বাংলার কিংবদন্তী গায়ক নচিকেতা, মান্না'দেরা। আমাদের এন্ড্রু কিশোর, খালিদ হাসান মিলু, ফেরদৌস ওয়াহিদরা যোগ্য সঙ্গ দিয়েছে তাদের। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদউল্লাহর লেখা সেই 'ভালো আছি ভালো থেকো' গানের তো এখনো রীতিমত কাভার বের হয়, ট্রিবিউট বের হয়। লাখি আখন্দের অসংখ্য গানের কাভার বের হচ্ছে এখন। 'আগে যদি জানতাম' এর মত গান এখনকার গীতিকার, সুরকাররা চাইলেও বানাতে পারবে কিনা তা নিয়ে আছে ঢের সন্দেহ।
তখনকার বাংলা সিনেমাতেও ছিলো অসাধারণ সব গান। 'আগুনের দিন শেষ হবে একদিন' 'এখনতো সময় ভালোবাসার' 'সাথী তুমি আমার জীবনে' 'তুমি আমার এমনি একজন' 'চিরদিনই তুমি যে আমার' 'উত্তরে ভয়ংকর জঙ্গল'র মত সহস্র গান আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি উপহার দিয়েছে আমাদের। সাবিনা ইয়াসমিন, কনক চাপা, ফাহমিদা নবী এমনকি মমতাজও আমাদের উল্লাসিত করেছেন তাদের কন্ঠের যাদুতে।
Source আজম খান
এখনো বাংলা গান প্রকাশিত হয়। কিন্তু এখনকার গানে সেই স্বাদটা পাওয়া যায় না যা পাই কুমার বিশ্বজিৎ এর 'তোরে পুতুলের মত করে সাজিয়ে' হাসানের 'দিল কি দয়া হয় না', নচিকেতার 'নীলাঞ্জনা', আগুনের 'আমার স্বপ্নগুলো কেন এমন' অথবা 'ভালোবাসি তোমায় এতটা' সহ অনেক ক্লাসিক সেকেলে গানে পাই। হ্যাঁ, চেষ্টা অবশ্য হয়েছে। বালাম, হাবীবরা আমাদের শুরুর দশকে কিছু ভালোগান উপহার দিয়েছে। কিশোরের 'যাচ্ছো দূরে যাও তুমি' কিংবা তপুর 'বন্ধু' অথবা রাফার কম্পোজ করা গান আমাদের মুগ্ধ করে। গানের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।
তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সকল কাজই সহজ হয়ে গেছে। গানের চর্চা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের মিউজিক ইন্ডার্স্টির দিকে তাকালে মনেহয় এখন ভালো এবং কালজয়ী গান বের করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তখনকার দিনের জনপ্রিয় সব ব্যান্ড দলও এখন বাজারে নতুন এলবাম প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছে না। তাইতো অনেক শ্রোতাই ঝেঁকে গেছে ইন্ডিয়ান কিংবা ওয়েস্টার্ন মিউজিকের দিকে। আমাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে কবে কবে কোন নতুন শিল্পি কোন নতুন এলবাম বের করেছে তাও জানি না। খোজ রাখি না। বরং বলিউড কোন মুভির রিলিজ পাওয়া গান ঠিকই শুনেছি।
এখনকার যুগটা হয়ে গেছে ইউটিউবে কত মিলিয়ন ভিউ হয়েছে তার উপর গানের সফলতার মাপকাঠি নির্ভর করে। তাই যারা নতুন গান বানায় তারা গানের চেয়ে ভিডিওতে বেশি মনযোগ দেয়। গানের লিরিক্স থাকে ''দু'দু বার করে''র মত ভাল্গার কথাবার্তা। এজন্যই আমরা 'আমি শুনেছি সেদিন তুমি' কিংবা 'আগে যদি জানতাম' এর মত গভীরতার গান পাবো না। তবুও আশা রাখি একটা সময় হৃদয় খান যেমন 'অনুরণন' কিংবা 'জানি একদিন' 'আড়ালে' 'বলনা'র মত সুশ্রী গান বের করেছে এমন হুট করে ভালো গানের যুগ আবার চলে আসবে।