সকলের কাছেই পেয়ারা বেশ পছন্দের একটা ফল। সে কাঁচাই হোক বা পাকা। আমার কাছে একটু বেশিই পছন্দের। কারণ এই পেয়ারার সাথে আমার শৈশবের কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একা থাকলেই ভাবতে থাকি, আকাশ-পাতাল ভাবনা, পুরোনো দিনের কথা, কত কথা, কত স্মৃতি। আমাদের পুরাতন বাসার উঠোনে একটা পেয়ারা গাছ ছিলো। বিশাল পুকুর, তার এক পাড়ে নারিকেল, সুপারী,আম, পেয়ারা ইত্যাদি গাছপালায় ঘেরা শান্ত স্নিগ্ধ ছিলো আমাদের সেই ছোট্র বাসাটা। সারাদিন- রাত জুড়ে সে কি আনন্দ! পেয়ারা গাছের আগাটার প্রায় পুরাটাই ছিলো টিনের চালে মিশে একাকার। গাছে উঠে টিনের চালে বসে পেয়ারা খাওয়া ছিল আমার নিত্যদিনের অভ্যাস। কাঁচা হোক, পাকা হোক পেরে খেতাম সেই পেয়ারা। দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি কচকচে আর দারুন মিষ্টি ছিলো সেই পেয়ারা। ঐ গাছের পেয়ারা না খেলে আমার যেনো দিনটাই মাটি হয়ে যেতো। আমি তো বটেই যারাই খেতো তাদের অনেকেই এত সুন্দর পেয়ারা কোনদিন খায়নি বলে আমাদের সেই পেয়ারা গাছের পেয়ারার প্রশংসা করতো। উঠোনে পেয়ারা গাছের পাতা পরে পুরো স্তর হয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠে উঠোনে বের হয়ে দেখতাম কোথা থেকে টিয়া পাখি এসে তার সুন্দর ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে পাকা পেয়ারা খেয়ে গেছে। তাই দেখে পেয়ারা গাছে দুটো শালিক পাখি গাল ফুলিয়ে বসে আছে। দেখেই সারাদিনের জন্য মনটা ফুরফুরে হয়ে যেতো। আমি একা বসে সেই পাখি দু‘টোর সাথে ভাব জমাতে চেষ্টা করতাম। আজো চোখ বন্ধ করলে, আজো কোথাও পেয়ারা দেখলে, আজো কাউকে তৃপ্তি সহকারে পেয়ারা খেতে দেখলে আমি সেই দিনগুলোতে ফিরে যাই। সময় বয়ে চলে , সবাই বড় হয়ে যায় কিন্তু আমি আজো এত কিছুর ভিড়ে খুঁজে ফিরি আমার শৈশবকে।। শৈশবের কথা থাক। তার চেয়ে আসুন জেনে নিই পেয়ারার কিছু পুষ্টিগুণ সম্পর্কে :-
পেয়ারাতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি রয়েছে। যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরকে বিভিন্ন রোগের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি প্রদান করে।
পেয়ারাতে লাইকোপিন, ভিটামিন সি, কোয়ারসেটিন এর মত অনেকগুলো অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে যা শরীরের ক্যান্সারের কোষ বৃদ্ধি রোধ করে। এটি প্রোসটেট ক্যান্সার এবং স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
পেয়ারাতে প্রচুর পরিমাণ পটাশিয়াম, ভিটামিন সি রয়েছে। পটাশিয়াম নিয়মিত হৃদস্পন্দনের এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত ভাবে লাইকোপিন সমৃদ্ধ গোলাপি পেয়ারা খেলে কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি কমায়।
পেয়ারার রসে থাকা উপাদান ডায়াবেটিস মেলাইটাসের চিকিৎসায় খুবই কার্যকর। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে পেয়ারা পাতাও বেশ কার্যকর। কচি পেয়ারা পাতা শুকিয়ে মিহি গুঁড়ো করে ১ কাপ গরম পানিতে ১ চা চামচ দিয়ে ৫ মিনিট ঢেকে রেখে তারপর ছেঁকে নিয়ে পান করতে পারেন প্রতিদিন।
বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত সমস্যা যেমন ব্রংকাইটিস সারিয়ে তুলতে ভূমিকা রাখে পেয়ারা। উচ্চ পরিমাণে আয়রন এবং ভিটামিন সি থাকায় এটি শ্লেষ্মা কমিয়ে দেয়। তবে কাঁচা পেয়ারা ঠান্ডা জনিত সমস্যা দূর করতে কার্যকর।
ভিটামিন এ চোখের জন্য উপকারী। এতে থাকা ভিটামিন এ কর্নিয়াকে সুস্থ রাখে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পেয়ারা রাখুন। কাঁচা পেয়ারা ভিটামিন এ এর ভাল উৎস।
অনেক মেয়ের-ই মাসিককালিন পেট ব্যাথা হয়। এ সময় অনেকেই ব্যাথার ঔষধ খেয়ে থাকেন। কিন্তু এ সময় পেয়ারার পাতা চিবিয়ে বা রস খেলে মাসিককালিন ব্যাথা থেকে অধিকতর দ্রুত উপশম পাওয়া যায়।
এছাড়া পেয়ারা চুল পড়া রোধ করে ও নতুন চুল গজাতেও সহায়তা করে। পেয়ারার ভিটামিন সি চুল পড়া রোধে বিশেষভাবে কার্যকরী। পেয়ারা ওজন কমাতে সাহায্য করে। পেয়ারাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। এতে হজমের সমস্যার সমাধান হয়। পেয়ারা রক্তের চিনির মাত্রা কমাতেও বিশেষভাবে কার্যকরী। ত্বকের নানা সমস্যা দূর করে । পেয়ারার প্রায় ৮১% পানি। সুতরাং পেয়ারা খেলে দেহ জলশূন্যতার হাত থেকে রক্ষা পায়, ত্বক সুস্থ থাকে। পেয়ারার ভিটামিন সি ত্বকের কোলাজেন টিস্যুর সুরক্ষাতেও কাজ করে এবং পেয়ারার ভিটামিন এ, বি, সি, পটাশিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকে বয়সের ছাপ পড়া রোধ করে। আমাদের মস্তিষ্ক সুরক্ষায় কাজ করে।পেয়ারার ভিটামিন মস্তিস্কের নার্ভ রিলাক্স করতে সহায়তা করে।
অতএব বেশি বেশি পেয়ারা খান। খেতে না পারলে আমাকে কুরিয়ারে পাঠান।