সকালের ট্রেইন, গন্তব্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আগের দিন দুপুরে টুং করে একটা মেসেজ এসেছিল। আমার নাকি করোনার দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। অতি শীঘ্রই যেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ গিয়ে দ্বিতীয় ডোজ গ্রহন করি। করোনার বর্তমান যে সিচুয়েশন।, তাতে সময় নষ্ট করার কোনো মানেই দেখি না। তাই আজ সকালেই ঘুম থেকে উঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।
বর্তমানে আমি কুমিল্লা থাকলেও আমার টিকা দেয়ার কেন্দ্র পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, অর্থাৎ আমাদের গ্রামের বাড়ির হাসপাতালে। আর কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ট্রেইন। তাই আজকে সকালে সব কাজ ফেলে কুমিল্লা রেল স্টেশনে চলে গিয়েছিলাম সকালের ট্রেইনটা ধরার জন্য।
গত তিন চারদিন কুমিল্লার আবহাওয়া মেঘলা থাকলেও আজ সকালে থেকে মোটামুটি ভালই রোদ পড়েছে। প্রথমে অবশ্য ভেবেছিলাম অন্যান্য দিনের মতো আজকেও হয়তো বাইরে ঠান্ডা পড়বে। কিন্তু রেল স্টেশন পৌছতে পৌছতেই দেখি রোদ উঠে গেছে। গায়ে হুডি থাকায় অবশ্য গরমও লাগছিল খুব।
ট্রেইনের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় নি। স্টেশনে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মাঝেই ট্রেইন এসে হাজির।। আজকে অবশ্য যাত্রী সংখ্যা খুবই কম ছিল। অন্যান্য দিন এর চেয়েও বেশি যাত্রী থাকে। সকালে স্টেশনে এসে প্রায় ফাঁকা প্লার্টফর্ম দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল ট্রেইনটা হয়তো চলে গিয়েছে, তাই প্লার্টফর্ম এমন ফাঁকা হয়ে আছে। পরে টিকেট কাউন্টারে গিয়ে শুনলাম যে ট্রেইন এখনো আসে নি। শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। কারণ কোনো কারণে সকালের ট্রেইনটা মিস করলে আমাকে আবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো পরবর্তী ট্রেইনের জন্য। মাঝখানের এই ৩-৪ ঘন্টা স্টেশনে বসে বসে ট্রেইনের জন্য অপেক্ষা করাটা মোটেও সুখকর কোন বিষয় না।
কুমিল্লা থেকে কসবা অর্থাৎ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রেইনে চড়ে যেতে বেশি সময় লাগে না। ৩৫-৪০ মিনিটের মাঝেই পৌছে যাওয়া যায়। তবে মেইল ট্রেইন আরো সময় কিছুটা বেশি লাগে। কারণ এই ট্রেইনগুলো মাঝখানের প্রতিটা স্টেশনেই থামে এবং প্রতি স্টেশনে গড়ে ৫-৬ মিনিট করে ব্রেক নেয়। ফলে কসবা পৌছতে পৌছতে আরো ২৫-৩০ মিনিট বেশি সময় লেগে যায়।
যায় হোক, দুপুরের আগেই কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌছে যাই আমি। এই হাসপালে আমার ছোটবেলার বেশ কিছু দিন কেটেছিল। সেসব স্মৃতি অবশ্য আমার মনে নেই। কিন্তু মা ও নানুর কাছ থেকে ছোটবেলার সেই পুরানো স্মৃতিগুলো এখনো শুনি। খুব সম্ভবত আমার বয়স যখন ৫-৬ মাস ছিল, তখন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। তখন আমাকে এই হাসপাতালটাতে এনে ভর্তি করা হয়েছিল। আমার সাথে শুধু মা আর নানু ছিলেন। আর বাবা তো বান্দরবান চাকরির জন্য ছিলেন, তাই তিনি আসতে পারেন নি। যতবার এই হাসপাতালের সামনে আসি, ততবার নানু ও মায়ের মুখে শোনা সে সময়ের গল্পগুলো মনে পড়ে। কখনো সুযোগ পেলে সেই গল্পগুলো সকলের সাথে শেয়ার করবো।
আজকে হাসপাতালে তেমন একটা ভীড় ছিল না। আজকের তুলনায় গতমাসে, অর্থাৎ প্রথম ডোজের টিকা যখন নিতে গিয়েছিলাম, তখন ভীড়ের মাত্রাটা অনেক বেশি ছিল। একটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে এই হাসপাতালটার আয়তন ভালই বড়। সেজন্য রোগী ও রোগীর স্বজনদের সংখ্যা বেশি হলেও তেমন একটা বুঝা যায় না। তবে করোনার টিকা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা একেবারেই নেই বললে চলে। আমি যতক্ষণ হাসপাতালে ছিলাম, ততক্ষণে আমি ছাড়া আর ৩ জনকে মাত্র দেখেছিলাম, যারা টিকা নেয়ার জন্য এসেছিল।
যায় হোক, টিকা নেয়া শেষ করে হাসপাতালটা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম। বিশেষ করে হাসপাতালের পুরানো বিল্ডিং, যেখানে আমার ছোট বেলার ছোট কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। হলুদ রঙের পুরানো বিল্ডিংটা দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর সময় মনের ভেতর অদ্ভুত এক ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল, যেটা লিখে হয়তো বুঝানো সম্ভব না। এই হাসপাতালেরই এই ছোট করিডর দিয়ে আমার মা অসুস্থ অবস্থায় আমাকে কোলে নিয়ে কান্না করতে করতে এক রুম থেকে অন্য রুমে ডাক্তারের খোঁজে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। এসব স্মৃতিগুলো যতবার নানুর মুখে শুনি, ততবারই কান্না চলে আসে আমার।
হাসপাতালের ভেতর অবশ্য বেশিক্ষণ ঘুরাঘুরি করা সম্ভব না। কেমন যেন অস্বস্তিকর পরিবেশ। তার উপর বিভিন্ন রকমের রোগী দেখতে কারই বা ভাল লাগে? কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করার পরই মাথা ভন ভন করে উঠল। সাথে সাথেই হাসপাতাল থেকে বের হয়ে ভাল করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। এরপর নিজেকে একটু রিফ্রেশ করার জন্য হাসপাতালের বাইরের ছোট একটা দোকানে বসে চা খেয়ে নিলাম। এখানের চা টা অবশ্য মেশিনে বানানো হয়। তবে আমার কাছে এধরনের চা একদমই ভাল লাগে না। কেমন যেন গরম পানির শরবত মনে হয়। চা ফ্লেভারটা একেবারেই থাকে না এতে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না, কারণ এটা ছাড়া এখানে অন্য কোনো দোকানও ছিল না।
চা খাওয়ার সময় অবশ্য আমার পাশে একটা সঙ্গী ছিল। কোত্থেকে যেন একটা কুকুর এসে চুপচাপ আমার পাশে এসে অলস ভঙ্গীতে শুয়ে পড়লো। প্রথমে অবশ্য ভেবেছিলাম আমার কাছে হয়তো খাবার চাইতে এসেছে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ খেয়াল করার পর বুঝলাম যে না, সে আসলে খাবারের জন্য আসে নি। এই জায়গাটাতে রোদ খুব ভাল ভাবে পড়ছিল, তাই কিছুটা আরাম করে সূর্যস্নান করার জন্যই মূলত এই জায়গাটা বেছে নিয়েছিল সে। ইচ্ছে করছিল কিছু একটা কিনে ওকে খেতে দিই। কিন্তু দোকানদার সাফ মানা করে দিল। কারণ একবার খেতে দিলে এরা নাকি প্রতিদিনই এসে এই দোকানের সামনে বসে থাকবে খাবারের আশায়।
করোনার প্রথম ডোজ নেয়ার সময় যতটুকু ব্যাথা পেয়েছিলাম, এবার মনে হয় তার চেয়েও বেশি ব্যাথা পেয়েছি। তার উপর টিকা নেয়ার পর থেকে হাতে প্রচন্ড রকমের ব্যাথা তো ছিলই। সন্ধ্যার পর ব্যাথার মাত্রা আরো বেড়ে গিয়েছিল। সাথে প্রচন্ড জ্বর। কিছুক্ষণের জন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে জ্বরের মাত্রা কমে আসার পর কিছুটা স্বস্তি লেগেছিল। এখন অবশ্য জ্বর নেই, কিন্তু হাতের ব্যাথাটা ঠিকই রয়ে গিয়েছে। আজকের রাতটা কোনো ভাবে পার করে দিতে পারলেই হবে। কাল সকালে হয়তো আবারও সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপাতত তো দুই ডোজ কমপ্লিট করে ফেললাম। এখন শুধু বুস্টার ডোজটা বাকি রয়ে গেল। আশা করি আগামী মাসে এটাও কমপ্লিট হয়ে যাবে।