বয়সের সাথে সাথে নাকি মানুষের শারীরিক পরিবর্তন অনেক ঘটে। এখন কিছুটা এই কথার উপলব্ধি করতে পারি। ছোটবেলা থেকেই ঝকঝকে দুনিয়া দেখে অভ্যেস হওয়া আমি, এখন নিজের দৃষ্টির পরিবর্তন উপলব্ধি করছি। এই উপলব্ধিটা প্রায় অনেকদিন হয়েছে যেটা আমার মধ্যে ঘটছে। আমি যেটা কখনো ভাবি নি সেটা এখন আমার মধ্যে ঘটছে। দূরত্বের সবকিছুই নিজের চোখের জন্য এখন ঝাপসা দেখা যায়। চোখ কচলিয়ে বারবার চেষ্টা করি নতুন করে দেখার ভাবি ঘুমের ঘরে হয়তো সব ঘোলা দেখছি। এর কারণে কোন কিছুর প্রতি আমার আরো বেশী সময়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। যতক্ষণ না বুঝতে পারি যে সেখানে কি ঘটছে ততক্ষণ আমার দৃষ্টি সেই দিকেই স্থির থাকে।
মহামারীর জন্য এটা উপলব্ধি করার সময় পাইনি । কিন্তু যখনই ভার্সিটি খুলে দিল আর দৃষ্টি পড়ল ক্লাসের হোয়াইট বোর্ডে, তখন থেকেই বুঝতে পারছি চোখ দুটো পুরনো হতে শুরু করেছে। আমি যখন ক্লাসে অনেকক্ষণ ধরে বোডে তাকিয়ে কি লেখা আছে সেটা বোঝার চেষ্টা করি, তখন আমার টিচার চিন্তা করে ক্লাসের মধ্যে সবথেকে মনোযোগী ছাত্রী হয়তো আমি। কিন্তু বাস্তব চিত্র আমার কাছে ভিন্ন কিছু তখন উপস্থাপন করছিল। যেটা আমি কাউকে বুঝতে দিতে চাইছিলাম না। ছোটবেলা থেকেই চশমায় আমার খুব বেশি এলার্জি রয়েছে। যার কারণে আমি সবসময় চাইতাম অন্তত আমার চোখদুটো উন্মুক্ত থাক । কোন কাঁচে বন্দি নয়।
আপনি কখনো গাড়ির ভেতরে বসে দরজার কাচের বাইরে তাকিয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করার চেষ্টা করেছেন? আমি মনে করি যারা সব সময় চশমা পড়ে পৃথিবীটাকে দেখে ঠিক গাড়ির কাচের ভেতর থাকা মানুষগুলোর মতই। আপনি ঠিকই সব পরিষ্কার দেখতে পাবেন কিন্তু তার মাঝখানে একটা দেয়াল তৈরি করা থাকে। যেটা আপনাকে প্রকৃত সৌন্দর্য অনুভব করতে বাধা দেয় । ঠিক আমার কাছে চশমা পরা মানুষগুলোকেও তাদের দলের মনে হয়। আমি কখনোই তাই চাইনি সেই দলে নিজের নাম লেখাতে। অনেকেই রয়েছেন যারা অনেক শখ করে বিভিন্ন ধরনের চশমা ব্যবহার করে থাকেন। আমি ছোটবেলায় যেটা বলে থাকতাম যখনই কাউকে কালো চশমা পরা দেখতাম , সে হয়তো অন্ধ।
এখন সেই একই সময় আমার মধ্যে ধীরে ধীরে চলে আসছে। আমি চাইনা আমার দুটো চোখ থাকা শর্তে, আমি চার চোখ দিয়ে দুনিয়া দেখি। আপনাদের এমন অনেক বন্ধু রয়েছে যারা চশমা ছাড়া চোখে কিছু দেখতে পায় না। আপনি আমার সাথে একমত হবেন আপনারা তাদের কিছু সুন্দর নাম দিয়ে থাকেন। সেটা হতে পারে; ডাবল বেটারি, চাশমুশ অথবা চার চোখ। কারো কাছে এই নামগুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগে । কারণ তারা এই নামের ব্যাপারে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আমি কখনো চাইনি আমার নিজের সুন্দর নামটি মুছে ফেলে , কোন কৃত্রিম নাম আমার সাথে জুড়ে দেওয়া হোক।
অদ্ভুত এই সমস্যার সমাধান অনেকেই খুঁজে বের করতে চায়। এখন আপনার কাছে প্রশ্ন আসতে পারে এটা আবার অদ্ভুত সমস্যা কিভাবে ? ধরুন, আমার দূরের কিছু দেখতে সমস্যা হয়। আমি এমন কারো কাছে শুনেছি যাদের কাছের জিনিস দেখতে সমস্যা হয় । তাই এটা আমার কাছে বেশ অদ্ভুত সমস্যা বলে মনে হয়। অস্পষ্ট দৃষ্টি আমাকে অনেক কষ্ট দেয়। কারণ আমি অনেক সময় দূরে থাকা প্রিয় মানুষ গুলোকে চিনতে পারিনা। আপনি কি জানেন দূর থেকে আমি কোন মানুষকে কেমন দেখতে পাই? আপনি কিছু জলছবিতে দেখবেন মানুষের চেহারার আকৃতিটা স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা হয় না । সেটা জল ছবির মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়। আমার চোখেও এখন ঝাপসা এক জলছবি তৈরি করা রয়েছে।
যার কারণে আমি দূর থেকে শুধু একটি মানুষের আকৃতি অনুসন্ধান করতে পারি। যার জল ছবির মধ্যে তার চেহারা লুকিয়ে থাকে। কোন ভাবেই সেটাকে আমি দূর থেকে তাকিয়ে খুঁজে বের করতে পারি না । এটা আমার জন্য দুঃখজনক। কারণ আমি সবসময়ই কোন মানুষের চোখের দৃষ্টি ভালোবাসি । কাচে বন্দী করা কোন চোখ নয়। যেখানে নাকি চোখ কখনো মিথ্যে বলে না, সেখানে যদি চোখগুলোই বন্দি থাকে । সেখানে সত্যমিথ্যা খেলার ধারণাটাও পাল্টে যায়। কাচে বন্দী থাকা চোখ গুলোর জন্য দুনিয়াটা দেখতে বেশ ভারী মনে হয়। সকালের শিশির বিন্দুর মতো চোখ গুলোতে থাক অফুরন্ত ভালোবাসা। ঝাপসা দেয়াল পেরিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠুক পরিচিত সেই মায়াবী মুখ গুলো।