আজকের দিনটা অন্য দিনের তুলনায় একটু খারাপ ই যাচ্ছে বলতে হয়। বিজনেস ড্রিল টা হোল্ড হয়ে গেলো, তার উপর আবার বর্ষার সাথে দেখা । নাহ সামনের কয়েকটা দিনও যে একটু খারাপ কাটবে সে বেশ বুঝতে পারছি ।
আমি লিমন, ছোটখাটো একটা টেক্সটাইল কোম্পানির মালিক । অনেক কাটখড় পুড়িয়ে আজকের এই অবস্থানে আসতে হয়েছে আমাকে । যাকগে, সেসব কথা নাই বললাম।
আমাদের এডমিন ম্যানেজারের প্রেজেন্টেশন ক্লাইন্টের পছন্দ হয়নি যেকারনে অনেক কথা কাটাকাটি করতে হয়েছে তাদের সাথে। থাক সেসব কথা ;
মিটিং থেকে বেরিয়েই ধানমন্ডির একটা মধ্যমানের কফি হাউজে ঢুকলাম একটু কোল্ড কফি খেতে । বিধিবাম, সেখানেই বর্ষার সাথে দেখা হয়ে গেলো ;
*সেই বর্ষা যাকে না দেখতে পেলে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যেতো ; কিন্তু কি আশ্চর্য এখন আর তার কথা খুব একটা মনেই পড়েনা। মাঝে মাঝে নিজেকে স্বার্থপর মনে হয় ; সে নাহয় বাধ্য হয়ে আমাকে ছেড়ে গেছে, তাই বলে কি আমারও তাকে ভুলে যাওয়া সাজে ! থাকনা হৃদয়ের কোন এক ক্ষুদ্র কক্ষে, মন্দ কি তাতে। আজকাল আর এসব নিয়া ভাবার অবকাশও পাইনা।
বর্ষা নিশ্চই কোল্ড কফি খেতে এসেছে, কোল্ড কফি বর্ষার খুব প্রিয় ছিলো।
আগের চেয়ে একটু ফর্সা দেখাচ্ছে বর্ষাকে, সাথে একটা বাচ্চা মেয়েও আছে ; বুঝতে দেরি হলনা এটা বর্ষারই মেয়ে। দুজন মনে হয় অর্ডারের জন্য আপেক্ষা করছে । কি মিষ্টি দেখতে মেয়েটি । হঠাৎ মনে হল সেখানে আমার প্রবেশ নিতান্ত ছোটখাটো ঝামেলা বৈ কিছুই নয় ।
কিন্তু বর্ষার চোখ এড়াতে পারলাম কই।
ভাবনায় ছেদ পড়লো বর্ষার ডাকে, " লিমন"
নির্জীব ভঙ্গিমায় ভেতরে প্রবেশ করে ওদের সামনের চেয়ারে বসলাম।
আমি যখন কোন একটা সমস্যায় পড়তাম বর্ষা ঠিক আমার চেহারা দেখে বুঝে নিতো আজও আমার উপস্থিতি তার চোখ এড়াতে পারলোনা।
="ভালো আছো ? " - একটু সময় নিয়ে বর্ষা বললো ।
=ভালো, ও হ্যা ভালো আছি। তুমি কেমন আছ ? আর বাচ্চাটা কেমন আছে? নিশ্চই তোমার বাচ্চা, কি নাম ওর ?
=আগের মতই বেশি কথা বলার স্বভাব রয়ে গেছে তোমার (মুচকি হাসি)
=আমিও নিরামিষ ভাবে হাসতে চেষ্টা করলাম। (মনে মনে বললাম, আর কথা বলা; আজকাল গুলি মেরেও মানুষ দরকারের চেয়ে বেশি দু-একটা কথা আমার মুখ দিয়ে বের করতে পারেনা। তুমি চলে যাওয়ার সাথে সাথেই অভ্যাসটাও হারিয়ে গেছে )
=কেমন যাচ্ছে দিনকাল ?
=হ্যাঁ ভালোই। ছোটখাটো একটা ব্যাবসা করছি। তা ইউএসএ থেকে দেশে ফিরলে কবে ?
=মামনি, এই আঙ্কেল টা কে ? (বাচ্চাটা বলে উঠলো)
=তোমার আঙ্কেল মামনি,
আর আমরা এখন দেশেই থাকি। এখানেই আপাতত সেটেলমেন্ট করেছি। ও ব্যবসা করছে টেক্সটাইল এর। আর এটা আমারই মেয়ে, নাম ইথিকা জাহান ।
=অন্য কোন নাম নেই ?
=মামনি (বাচ্চাটা কিছু একটা বলতে ছেয়েছিল, বর্ষা তাকে থামিয়ে দিল,
আমি আর বর্ষা মিলে ঠিক করেছিলাম আমাদের মেয়ে হলে তার নাম নিঝুম রাখবো, হয়তো তাই রেখেছে ; বাচ্চাটা হয়তোবা তার ডাকনাম টাই বলতে চেয়েছিলো। আর বর্ষা তাকে থামিয়ে দিল, এ যেন বহুদিন আগে বুনা একটি নিষ্প্রাণ সপ্ন কে গোপন করার প্রচেষ্টা ।
=বিয়ে করেছো ? (বর্ষা বলে উঠলো)
=আসলে কাজের ব্যস্ততায় আর করা হয়ে ওঠেনি। এ নিয়ে মায়ের সাথে বেশ মনোমালিন্য চলছে। (আমি)
=করে নাও, করে ফেল্লেই ঝামেলা মিটে যায় ,
=তাই ভাবছি, আচ্ছা তোমার হাসব্যান্ডের বিজনেস গ্রুপের নাম কি ?
=ইউনিক টেক্সটাইল লিমিটেড।
=বাহ, শাফিন সাহেব তোমার হাসব্যান্ড ?
=চেনাজানা আছে তাহলে ?
=সে আর বলতে।
আরো অনেক কথাই হলো বর্ষার সাথে; নিজের কথা, সন্তানের কথা, ভবিষ্যতের কথা আরো কত কি। কেমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় কথা বলে যাচ্ছে মেয়েটা। এক পর্যায়ে লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম "আমার কথা কি তোমার মনে পড়ে? "
=সত্যি কথা বলতে এসবের সময়ই পাইনা; বাচ্চার লেখাপড়া,স্বামী, সংসার -এত ব্যস্ততার ভিড়ে অতীত নিয়ে ভাবার সময় কই ( নির্লিপ্ত ভাবেই উত্তর দিল)
=এখনো কি রাতে না খেয়ে থাকো ?
=নাহ, আমি না খেলে ওর বাবা আর ও কেউই খেতে চায়না। তাই অভ্যাস করে নিয়েছি।
= আমি আর বলার মত কোন কথা অনেক খোজাখুজি করেও পেলাম না। বুঝলাম আলাপের সমাপ্তির সময় এসে গেছে, বর্ষার ও তাড়া আছে যেটা ও না বললেও বেশ বোঝা যাচ্ছে। তাই বললাম "ভালো থেকো।"
-বর্ষা আমার দিকে গভীর চোখে তাকালো, হয়তো আমার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছে ; আমি এদিক ওদিক তাকাতে শুরু করলাম। কে জানে আবার কি বুঝে নেয় সে ভয়ে।
=আমি সত্যিই ভালো আছি, তুমি ভালো থেকো। নিজের আর আন্টির খেয়াল রেখো। আর খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিও। (বর্ষা একটু সময় নিয়ে বললো)
=আমি মুচকি হাসলাম।
ও আমার বিল সহ পে করতে চাইলো, আমিও না করলাম না। শেষবার যখন আমাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছিলো তখনো না করিনি, এখনো না । বাচ্চাটাকে একটা চুমু দিয়ে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলাম।
.
আনমনে অজানা পথে হেটে চলেছি, একটা গান শুনার ইচ্ছে জাগলো ; আবার ভাবলাম থাক । ঘুরেফিরে বর্ষার কথাই ভাবতে ইচ্ছে করছে। আমি খুব ভালো ভাবেই বিশ্বাস করেছি বর্ষা ভালো আছে। শাফিন সাহেব খুব ভালো মনের একজন মানুষ। তার মনটা বেশ সাদামাটা। তার কাছে বর্ষা ভালোই থাকবে। দিন পনেরো আগেও দেখা হয়েছিলো তার সাথে, অনেকক্ষণ কথাও হয়েছে চা খাওয়ার ফাকে।
ভালোবাসের মানুষ ভালো আছে এটা শুনে ভালোই লাগলো। এটা নিয়ে হিংসা করার মত এতটা স্বার্থপর আমি নই, তবে একটা আক্ষেপ থেকেই যায় ; দিনশেষে আমি কতটা ভালো আছি ?
আকাশের দিকে তাকালাম, আজকের আকাশটা বেশ নির্মল দেখাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন আমি রাতে ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কখনো কখনো দু-এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়তো। আজকাল বর্ষাকে মিস করলেও তার কথা মনে পড়লে কেন জানি আর আগের মত কষ্ট হয়না, দম বন্ধ হয়ে আসেনা। আমি কি ভুলতে পেরেছি আমার সেই প্রিয়তমা কে? এর উত্তর আমার কাছে নেই । আচ্ছা ভালোবাসা কি সত্যিই ভুলা যায় ? জানিনা বাপু, আমি অতো কাব্য-সাহিত্য বুঝিনা ।
.
আমার টেক্সটাইল মিল টার নাম "বর্ষা টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি। " টাকার জন্যই ওকে আমি হারিয়েছিলাম , তাই টাকার মেশিনটা নাহয় তার নামেই দিলাম । কারনটা ঠিক এটা নাকি ভালোবাসি বলে তার নামে দিয়েছি সে আজো বুঝে উঠতে পারিনি । সত্যিকারের ভালোবাসায় সত্যিই কি হ্যাপি এন্ডিং হয়, নাকি সত্যিকার ভালোবাসায় এন্ডিং বলে কোন শব্দই নেই ?
.
এসিস্টেন্ট ম্যানেজার আনিকা আমাকে খুব পছন্দ করে, অনেক ভালোও বাসে মনে হয়। ওর চেহারা দেখে খানেকটা তাই আন্দাজ করি। এমনি এমনি কি আর এ স্বার্থপর পৃথিবীতে কেউ কারো কথা ভাবে ? নিশ্চই না । তার উপর আবার আমার জন্য রান্নাও করে আনে প্রতিদিন, আমার আবার এসিডিটির সমস্যা কিনা। আমার মন খারাপ থাকলে নানা ধরনের কথা বলে মন ভালো করার চেষ্টা করে। মায়ের সাথেও বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে। আমিও এবার ভালো থাকার নিমিত্তে ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা চালালে মন্দ হয়না। অন্তত একটা মেয়ের ভালোবাসায় প্রাপ্তি দেয়ার চেষ্টা করে দেখি। ভাবছি কাল আনিকা কে একটি শুকনো গোলাপ উপহার দিয়ে বলবো - পারবে এটাকে আবার আগের মত প্রাণবন্ত করতে ? না, তোমাকে যে পারতেই হবে ।
.