এঞ্জেলিনা জোলি তার লারা ক্রাফট মুভিতে বলেছিলেন প্রকৃতির একটা ব্যালেন্সের উপর নির্ভর করে চলে। খারাপ অথবা ভালো, কোনটাকেই প্রকৃতি আলাদাভাবে প্রাধান্য দেয় নি। ভালোর গুরুত্ব বোঝার জন্য খারাপের অস্তিত্ব থাকাটা অনেক বেশি প্রয়োজন। অন্ধকার না থাকলে যেমন আলোর মর্যাদা বোঝা মুশকিল হতো, ঠিক তেমনি খারাপ আছে বলেই ভালোর এতো কদর। আর এটাই পৃথিব্র সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।
পৃথিবীতে খারাপ মানুষ থাকা খুব দরকার৷ অনেকে বলে, অমুকে'র মতো ভাল মানুষের জন্য পৃথিবী টিকে আছে। এসব শুনলে আমার হাসি পায়। আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবী টিকে আছে খারাপ মানুষদের জন্যে। কাল যদি সব খারাপ মানুষ ভাল হয়ে যায়, ভাল মানুষদের মুখোশ খুলে যাবে। ভাল মানুষরা গণহারে বেকার হয়ে যাবে। একদল মানুষকে খারাপ প্রমাণ করার জন্য আরেকদল মানুষ সমাজের চোখে আপাতদৃষ্টিতে ভাল, কিন্তু তারা সত্যিই ভাল না। কারণ, কারো কারো গল্পে এই ভাল মানুষরাই সবচেয়ে বড় ভিলেন। এই পৃথিবী নির্দিষ্ট কোনো ভাল মানুষদের জন্য টিকে নাই। পৃথিবী টিকে থাকার পেছনে খারাপ লোকেদেরও সমান ভূমিকা।
পৃথিবী অদ্ভুত ব্যালেন্সে চলছে। চোর ডাকাত যদি না থাকতো, তাহলে পুলিশদের কি কাজ হতো? যদি যুদ্ধ না থাকতো, তাহলে সৈন্য সামন্তদের কি হতো? সবাই যদি সৎ হয়ে যেতো, এই দুনিয়া বেঁচে থাকার পক্ষে খুবই কঠিন হতো। একেকটা বিশ্বাস একেকটা পণ্য। পৃথিবীতে হতাশা আছে বলেই বেস্ট সেলার কত বই লিখা হচ্ছে,অনুপ্রেরণামূলক। যেগুলো বাস্তব জীবনে কখনো কাজে লাগানো যায় না। কারণ, সবাই জীবনটাকে আলাদা রকমে ফেস করে৷ কেউ সফল না, কেউ সুখীও না। যাকে সফল ভেবে আপনি হিংসা করেন সে আসলে বড়জোর ভাল স্টোরিটেলার, যে নিজের গোপন হতাশা লুকিয়ে রাখতে পেরেছে। আপাতদৃষ্টিতে সুখ উপচে পড়া সম্পর্কগুলো আসলে সুখী না। প্রত্যেকটা মানুষ একজন আরেকজনের সাথে প্রতারণা করে বেড়াচ্ছে। বাইরে ভাব নিচ্ছে সুখী। মানুষ এমন বাজে প্রাণী যে নিজেও ভেতরে ভেতরে খারাপ থেকেও শুধু আরেকজনকে দেখানোর জন্য সুখী হওয়ার ভান করতে পারে।
আজকাল দেখি কেউ কেউ বলে, মরার আগে অমুক বই না পড়লেই না, অমুক জায়গায় না গেলেই নয়, অমুক সিনেমাটা মাস্ট ওয়াচ। অমুক বিষয় সম্পর্কে না জানলেই না। আমি এগুলো বিশ্বাস করি না। কোনো কিছু অপরিহার্য না। না কোনো মানুষ, না কোনো ম্যাটেরিয়ালস। মানুষ কোনো কিছুই পাল্টাতে পারে না। মানুষ একটা বৃহৎ চক্রাকার গোলকধাঁধার অংশ মাত্র। হ্যা, আমরা কিছু মানুষকে নিয়ে সেলিব্রেট করি বটে, আমরা আইনস্টাইন নিয়ে কথা বলি, আমরা শেক্সপিয়ার নিয়ে কথা বলি। তাতে ওই মরা লোকটার কিছু যায় আসে না। এমনকি যে রিকশাওয়ালা আইনস্টাইনকে চেনে না তারও কিছু যায় আসে না।
এই পৃথিবী খুব সাধারণ একটা জায়গা। আপনি কত বড় নেতা, কত মেধাবী, কত সুন্দর তাতে আমার কিছু যায় আসে না যতক্ষণ না আমি আপনাকে চিনি। একবার বায়তুল মোকাররমের সামনে এক নেতাকে রিকশাওয়ালা "হা**র পোলা" বলে গালি দিসে। কিন্তু, সেই একই রিকশাওয়ালা নিজের পরিচিত কোনো নেতার সামনে গিয়ে হাউয়ার পোলা বলতে পারবে না। ব্যাপারটা হচ্ছে, আপনার অস্তিত্বকে আপনি যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন, ততটা গুরুত্বপূর্ণ না এটা। আপনার চেনা জগতের বাইরে, কম্ফোর্ট জোনের বাইরে আপনি একজন নোবডি। আসলেই আপনি একজন নোবডি। তার মানে এই না আপনি পুরোটাই মিথ্যা, আপনার কাজ মিথ্যা - মিথ্যাটা হলো আপনার ধারণা, অহংকার, জাজমেন্ট, সুপেরিয়র ভাবাটা।
আপনি আশাবাদী, দুনিয়ায় খারাপ মানুষ থাকবে না, তাতে খারাপ মানুষের কিছু যায় আসে না। কারণ, কারো কারো কাছে আপনিও মারাত্মক খারাপ। আপনি ঘৃণা করেন একজনকে, আবার আরেকজন আপনাকে ঘৃণা করে। আপনি একজনকে ভালবাসেন, আবার অন্য দিকে আরেকজন আপনাকে ভালবাসে। এগুলো এক একটা চক্র। এই চক্রে আপনি আসলে খুব আহামরি বড় কেউ না। ইউ আর আ ফাকিং স্মল ক্রিয়েচার। পৃথিবীর প্রতি নিজের কন্ট্রিবিউশন, আত্মত্যাগ নিয়ে এতো আহামরি ভাবনার কিছু নেই। ইউ কান্ট চেঞ্জ দ্যা ওয়ার্ল্ড, বিকজ ওয়ার্ল্ড ইজ টু বিগ টু চেঞ্জ।
আপনি শুধু এই ভেবে খুশি হতে পারেন যে, আপনি মারা গেলে কিছু মানুষ খুশি হবে। যে এম্বুলেন্সে লাশটা যাবে ওই এম্বুলেন্স চালক কিছু টাকা পাবে। চিরবিদায় স্টোরের ওই লোকটা একটা কফিন বিক্রি করে সেটা দিয়ে সংসার চালাবে। কবরস্থানের গোরখোদক যে আপনার কবর কাটবে সেও বিমর্ষ ভঙ্গিতে কবর কাটতে কাটতে ভেতরে খুশি হবে অনাগত নগদ অর্থ প্রাপ্তির মোহে। বেঁচে থাকতে অন্যের মৃত্যুর দামও যেমন আপনার কাছে থাকে না, আপনার ক্ষেত্রেও সেটাই হবে। ডেথ ক্যালকুলেটর হিসাবে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে সারা পৃথিবীতে। তাতে কি এসে যাচ্ছে কার! মানুষ বিবিধ পরিসংখ্যানের একটা র্যান্ডম সেম্পল ছাড়া আর কিছু না..