২৪ অক্টোবর, সাররাত গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ। ইন্টারনেটের গতিও কম, কিন্তু ঘুমানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। সেজন্য ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সকাল ১১ বেজে গেছে। ফেসবুকের ম্যাসেজ চেক করতে গিয়ে দেখি হাইস্কুলের এক হিন্দু বন্ধু, পূজার শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
বন্ধুঃ শরদীয় শুভেচ্ছা বন্ধু।
আমিঃ ধন্যবাদ বন্ধু। কেমন আছোস? আজকে থেকে পূজা নাকি?
বন্ধুঃ ভালো আছি। তোর কি অবস্থা? না,কালকে থেকে শুরু হইছে। আজকে সপ্তমী। তাহলে বিকেলে আমাদের এইদিকে চলে আয়। ওদের সাথে আসিস।
আমিঃ ওরা সবাই যাবে নাকি? কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে কেমনে কি!!
বন্ধুঃ হ্যা,ওরা আসবে, তুই ওদের সাথে আসিস। বৃষ্টি কমে যাবে,অবশ্যই আসবি কিন্তু। দেখা হচ্ছে তাহলে আজকে। বাই
আমিঃ দেখা হচ্ছে! বাই।
প্রতিবছরই দূর্গাপূজার এই সময়ে নিমন্ত্রণ পাই। আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের বেশ কয়েকজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী আছে। হাইস্কুলে থাকাকালীন সময় থেকেই আমার হিন্দু বন্ধুদের সাথে সম্প্রীতি খুব ভালো ছিলো, এখনো আছে । মিশতাম,ওদের বাসায় আমরা যেতাম, খাওয়া দাওয়া করতাম। কোন পার্থক্য তৈরী করতাম না আমরা। সেজন্য সমাজের কিছু মানুষ আমাদের দৃষ্টিকটু চোখে দেখতো।
সবাই এখন ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে,সেজন্য এখন সবাই একসাথে হওয়া হয়। যার যার প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে ব্যাস্ত সবাই। বছর কালীন একবার গ্রামে আসলে তখন সবার সাথে দেখা হয়। পুরনো দিনগুলোর স্মৃতি চারণ করার জন্য হলেও বন্ধুদের সাথে বছরান্তে একবার দেখা করা হয়।
প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও গুনে গুনে বেশ কয়েকটা দূর্গাপূজার নিমন্ত্রণ পেয়েছি। হিন্দুদের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো এই দূর্গাপুজা,এ পুজা নিয়ে তাদের আয়োজনের কমতি থাকে না। এই সময় প্রত্যেক হিন্দু বাড়িতে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ থাকে হরেক রকমের খাবার। তাই আমি একটু বেশি উত্তেজিত :3
কিন্তু বৃষ্টি যেন থামছেই না। বৃষ্টি ছাড়া অপেক্ষা করতে করতে সন্ধা হয়ে গেলো। একবার ভাবলাম, যাব না!কিন্তু আমাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সেটা ভেবেই ৬ বন্ধু বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আর না গেলেও বন্ধু মন খারাপ করবে,নানান দিক বিবেচনা করে বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পরি।
আসলে বন্ধুদের বাড়িতে খাবারের আয়োজন আমার সব সময়ই ভালো লাগে,এটাও ব্যাতিক্রম ছিলো না। বেশকিছু আইটেম সামনে আসলো। সবগুলোই প্রায় অনেক পছন্দের। এগুলো খেতেই ৩০ মিনিট শেষ করলাম। আহ! কি ভালোই না লাগছিলো এতো দিন পর সব বন্ধু একজায়গায়। হরেকরকমের নাড়ু আর আড্ডা, অন্যরকম অনুভূতি!
এ পালায় খাবার শেষ করে উঠতে না উঠতেই, লুচি-লাবড়া নিয়ে আসলো। দেখতে অনেক সুস্বাদু লাগছিলো প্রতিবারের মতো।
আমিঃ আগে বলবি তো! আমি পেটে জায়গা খালি রাখতাম
বন্ধুর আম্মুঃ কি বলো! কিছুই তো খাও নাই,এতো তারাতাড়ি পেট ভর্তি হলে চলবে!
আমিঃ জ্বি! আন্টি।
বিসমিল্লাহ বলে সবার সাথে আমিও খাওয়া শুরু করলাম। লুচি,লাবড়া, পায়েস মজাই লাগতেছিলো দুটো খাওয়া পর্যন্ত। তৃতীয়টা খেতে যেতেই আর খেতে পারছিলাম না। আমায় না খেয়ে বসে থাকতে দেখে, আন্টি প্লেটে খিচুড়ি দিয়ে ভর্তি করে দিল:(
এতো কিছু দেখে প্রথমে এক্সসাইটেট থাকলেও তখন দম বন্ধ হয়ে আসতেছিলো। কিছু বলতেও পারছিলাম না, খেতোও পারছিলাম না। সবার খাওয়া শেষ কিন্তু আমার খাওয়া শেষ হচ্ছে না! কিন্তু কেউ বলে না যে, না খেতে পারলে রেখে দে! আমার খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতেছে সবাই। ৪০মিনিট পর, একটা শান্তশিষ্ট বন্ধুকে টেক্সট করলাম।
আমি আর খেতে পারছি না।
বন্ধুঃ তুই মনে হয় আর খেতে পারবি না, রাখ আর খেতে হবে না।আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
অনেক সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত এসেছিলাম৷
তখন অনেক শান্তি লাগতেছিলো। এরকম বন্ধু থাকলে, আরকি লাগে :3
খাওয়া দাওয়া শেষ করে বের হয়ে দেখি তবুও বৃষ্টি ছাড়েনি, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এখনো পড়তেই আছে।